সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

The Origin Of Science

লিখেছেনঃ ফরহাদ হোসেন মিঠু



•১)
বিজ্ঞানের প্রাথমিক বিষয়গুলোর উৎস কি ? সব কিছুরই একটা উৎস আছে । বিজ্ঞানেরও আছে।আপনি যদি ডারউইনিস্টদের মত ভাবেন বিজ্ঞান শুধুমাত্র মানবজাতির জানার আগ্রহ থেকে জন্ম নিয়েছে তাহলে আপনি ভুল ভাবছেন। 
আধুনিক বিজ্ঞানের এত উন্নতির পিছনে মূলত দুইটা কারণ আছে।একটা হল মধ্যযুগের মুসলিমদের দ্বারা বিজ্ঞান চর্চা , আরেকটা হল ইউরোপের বিজ্ঞান বিপ্লব যা কিনা শুরু হয়েছিল Giordano Brunoর মাধ্যমে এবং শেষ হয়েছিল নিউটনের Principia Mathematica দিয়ে।এরপর মানবজাতিকে বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করতে আর বেশি কষ্ট করতে হয়নি। এখানে অবাক করার বিষয় হল আরবে বিজ্ঞান বিপ্লব ও ইউরোপে বিজ্ঞান বিপ্লবের পিছনে ছিল Theism বা আস্তিকতার ভূমিকা।আরো স্পষ্টভাবে বললে Monotheism এর কথা উল্লেখ করতে হবে।


বিজ্ঞানের মূল উৎসে যে Convictionটা (বিশ্বাস) আছে সেটা হচ্ছে  মহাবিশ্বের অসাধারণ সুবিন্যস্ততা,এর সুশৃঙ্খলতা।কিন্তু এই Convictionটি এসেছে কিভাবে?ক্যালভিন চক্রের (C3 Cycle) আবিষ্কারক,বায়োকেমেস্ট্রিতে নোবেল পুরষ্কার প্রাপ্ত মেলভিন ক্যালভিন এই বিষয়ে বলেন-

“As I try to discern the origin of that conviction,I seem to find it in a basic notion discovered 2,000 or 3,000 years ago, and enunciated first in the Western world by the ancient Hebrews: namely that the universe is governed
by a single God, and is not the product of the whims of many gods, each
governing his own province according to his own laws. This monotheistic
view seems to be the historical foundation for modem science.”[1]


বিজ্ঞানের উৎসের কথা আলোচনায় আসলে অনেকেই প্রথমে গ্রীকদের কথা বলে অথচ গ্রীকরা Polytheism এ বিশ্বাসী ছিল।তবে এটা ঠিক যে গ্রীকরা বিজ্ঞানের উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল কিন্তু গ্রীকরা যে বিজ্ঞানকে উন্নত করেছিল সেটা গ্রীকদের আগেই এসেছিল।মেলভিন ক্যালভিনের উপরিউক্ত কথার গুরুত্বটা এখানেই।
মানবজাতিকে বিজ্ঞানের মূল বিষয়গুলো সম্পর্কে একত্ববাদে বিশ্বাসী একজন ব্যক্তি শিক্ষা দিয়েছিলেন।


সেই ব্যক্তি এখন সর্বাধিক পরিচিত  Hermes Trismegistus নামে। তাঁর পুস্তকগুলোকে একত্রে 'Corpus Hermeticum' বলা হয় এবং উনার একমাত্র পূণাংগ বইয়ের নাম হল Asclepius (The Perfect Word) ।


কিন্তু এই Hermes Trismegistus আসলে কে? 'Corpus Hermeticum' দেখলে বুঝা যায় যে Hermes একজন রিলেজিয়াস লিডার ছিলেন। Hermes এর শিষ্যরা যে তাঁর লেখাগুলোও বিকৃত করেছিল তাও বুঝতে পারা যায়।
 
Hermes Trimegistus অর্থ হল Thrice-Great Hermes । Thrice-Greatহল Hermes এর উপাধি।
আর এই উপাধিপ্রাপ্ত ব্যক্তি আর কেউ নন তিনি হলেন ইদরীস (আঃ ) । ইসলামিক স্কলাররা ইদরীস (আঃ) এর সম্পর্কে এই বর্ণনাই দিয়েছেন। আর বাইবেলে তাঁকে Enoch নাম দেয়া হয়েছে।

আরবদের নজরে এই বিষয়টা প্রথম ধরা পড়ে Sabianনাম এক ধর্মীয় গ্রুপের কারণে।Sabianদের রাজ্য যখন খলিফা আল-মামুনের হাতে পড়ে তখন খলিফা Sabianদের বলে তোমরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ কর না হলে তোমরা নিজেদের আহলে কিতাব বলে প্রমাণ কর যাতে তোমরা জিযিয়া দেয়ার যোগ্য হও আর এই দুটোর কোনটাই না করতে পারলে তোমাদের বিরুদ্ধে আমরা জিহাদ ঘোষণা করব।[২]

 সৌভাগ্যক্রমে Sabianরা নিজেদের আহলে কিতাব হিসেবে প্রমাণ করতে পারে এবং তারা দাবি করে যে Hermes হলেন তাদের নবী । কুর'আনে তিন জায়গায় (২:৬২ , ২২:১৭ , ৫:৬৯) Sabian দের কথা বর্ণিত হয়েছে , আর পূর্ববর্তী স্কলাররা ইদরীস(আঃ)-কে Hermes হিসেবে আইডেন্টিফাই করতে পেরেছিলেন কারণ এই দুই ব্যক্তির উপাধি (Thrice-Great) একই ছিল।

ইবনে কাসীর (রহিমাহুল্লাহ্‌ ) তাঁর আল বিদায়া ওয়ান নিহায়াতে ( ইংরেজী বই Prophets in the Quran দেখুন ) বলেছেন--

" ...Many of the Scholars allege that he wast he first to speak about this and they call him Thrice-Great Hermes ।" [৩]


The Vision of Hermes এ একটা ঘটনা আছে যেখানে একজন Divine Being কে Hermes এর সাথে কথা বলতে দেখা যায়।আর Deductive Reasoning অনুযায়ী সেই Divine Being ছিলেন একজন ফেরেশতা।ঘটনাটি ছিল এইরকম-


একদিন Hermes সব বস্তুর উৎস সম্পর্কে চিন্তা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েন। কিছুক্ষণ পর তার মনে হতে থাকে যে তার আত্মা শূন্যে উঠে গিয়েছে। এরপর এক বিশাল সত্ত্বা তাঁকে নাম ধরে ডাকে।
Hermes তখন বললেন, “ Who art (are) thou (you)?”


"I am Osiris, the sovereign Intelligence who is able to unveil all things. What desirest (desire) thou(you)?"


Hermes: "To behold the source of beings, O divine Osiris, and to know God."


এই কথা বলার পর Hermes এক সুন্দর আলো দেখতে পান। Osiris এই আলো সম্পর্কে Hermes কে বলেছিলেন-
“The light thou (you) didst (did) first see is the divine intelligence which contains all things in potentiality,enclosing the models of all beings.” [৪]


Hermes পরবর্তীতে জিজ্ঞেস করেছিলেন – “"Can souls die?"


Osiris জবাবে বলেছিলেন- "Yes,many perish in the fatal descent. The soul is the daughter of heaven, and its journey is a test. If it loses the memory of its origin, in its unbridled love of matter, the divine spark which was in it and which might have become more brilliant than a star, returns to the ethereal region, a lifeless atom, and the soul disaggregates in the vortex of gross elements." [৪]


উপরে Soul নিয়ে যে বিষয়টা উল্লেখ করা হয়েছেসেটা হল “THE COVENANTS WE HAD SWORN (GIVEN) TO ALLAH IN THE PRE-ETERNITY”

ক্বুর’আনে আল্লাহ্‌ তাআলা বলেছেন-
“And (remember) when your Lord brought forth from the Children of Adam, from their backs (loins) their seed (offspring, descendants)and made them bear witness as to their own souls: Am I not your Lord? They said: “Yes”! We bear witness (We testify). Lest you should say on the Day of Resurrection: “Verily we were unaware of this.” ( Surah Al-A’râf – 172)



“Did I not take an covenant from you, O Children of Adam!That you should not serve (be servants of) Satan? Surely he is an open enemy toYou,” (Surah Yâ-Sîn – 60)
(এই সম্পর্কে আরো বিস্তারিত দলিল পাবেন এখানে- http://bit.ly/1KAFESj)


Osiris কে সবাই চিনে Egyptian God হিসেবে অথচ Osiris এর ফেরেশতা হবার পক্ষে যৌক্তিক প্রমাণ আছে।তৎকালীন মিশরীয়রা Polytheist হওয়ায় এরা Osiris  এবং Hermes উভয়কেই গড বানিয়েছিল।
Ancient Polytheistরা যাই মনে করুক,Hermes যে একজন মানুষ ছিলেন তা এখন অনেকেই বিশ্বাস করেন। Renaissanceএর সময়কার বিজ্ঞানীরাও Hermesকে একজন মানুষ মনে করতেন।ব্রিটিশ হিস্টোরিয়ান  Frances A. Yates এই বিষয়ে বলেন-
 "It was on excellent authority that the Renaissance accepted Hermes Trismegistus as a real person of great antiquity and as the author of the Hermetic writings." [৫]





২)
হিস্টোরিয়ানদের ধারণা Hermes এর জন্ম হয়েছিল মিশরে। নির্দিষ্ট ভাবে কোন একদেশকে Hermes এর জন্মস্থান বলাকে আমি সমর্থন করি না।আমি বিশ্বাস করি Hermes এর জন্ম হয়েছিল মেসোপটেমিয়ার অন্তর্ভুক্ত কোন এক অঞ্চলে । হ্যাঁ সেটামিশর হতে পারে কারণ মিশর মেসোপটেমিয়ান অঞ্চলের অন্তুর্ভুক্ত ছিল, সাথে ইরাকও ছিল ।



 ইদরীস (আঃ) এর নাম ও তাঁর লেখাগুলোকে বিকৃত করায় বড় ভূমিকা পালন করেছে মূলত দুইটা দল । আর উভয় দলই ছিল Polytheism এ বিশ্বাসী। এদের একটা দল হল মিশরীয়রা আরেকটা হল গ্রিকরা ,রোমানদের ভূমিকাও আছে অবশ্য।

সম্ভবত মিশরীয়রাই সর্বপ্রথম ইদরীস (আঃ)-কে গড বানিয়েছিল।মিশরীয়রা ইদরীস(আঃ)কে কিংবা তার বিকৃত নামকে Thoth নাম দিয়েছিল। মিশরীয়দের বিশ্বাস অনুযায়ী Thoth লেখার পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন , বিজ্ঞানের উন্নতি করার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। তারা বিশ্বাস করত Thoth হল 'God of Knowledge and Wisdom' ।
এই Thoth এর নাম পরিবর্তন করে ইদরীস (আঃ)-কে গ্রিকরা Hermes নাম দেয়। এর অন্যতম শক্তিশালী প্রমাণ পাওয়া যায় ১৯৬৫ সালের একটা Inscription এ ।এই Inscription এর শেষের দিকে এইবাক্যটা লেখা ছিল-- 

"Isis , the great goddess , and Thoth, the three times great." [৬]

Three Times Great-উপাধির সংক্ষিপ্তরূপ হল Thrice-Great ,গ্রিকদের ভাষায় Trismegistus। এই উপাধিটা গ্রিকদের বইতে যেমন দেখা গিয়েছে তেমনি ইসলামিক স্কলারদের বই যেমন ইবন কাসীরের (রহ:)  বইতেও দেখা গিয়েছে।

আলেক্সজান্ডার দি গ্রেটের দ্বারা মিশর জয়ের মাধ্যমে গ্রিকরা Corpus Hermeticum এর সংস্পর্শে এসেছিল। এরপর তো গ্রিকদের মধ্যে একের পর এক বিজ্ঞানীর জন্ম হতে লাগল।এর উদাহরণ হিসেবে আর্কিমিডিসের কথা বলাই যথেষ্ট।
মিশরের Alexandria শহরে জন্ম নেয়া আর্কিমিডিসকে আমরা বিজ্ঞানীরূপে দেখছি মূলত ইদরীস ( আঃ)  এর শিক্ষার কারণে। একটা শিক্ষিত ও তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে আধুনিক রাজ্য (মিশর)জয়ের মাধ্যমে যে একটা জাতির কতটা উন্নতি হতে পারে সেটা দেখিয়েছিল আলেক্সজান্ডার।
গ্রিকদের স্বভাবই ছিল মহান ব্যক্তিদের নিজেদের গড বা গডের পুত্র বানিয়ে দেয়া।কেন তারা এই পাগলামী করত জানি না তবে মহান ব্যক্তিদের নিজেদের গড বা গডের পুত্র বানিয়ে তারা হয়তো একটা সুবিধা নিত। হয়তো এইকাজ করে ওরা অন্য ধর্মের লোকদের বলত--
" এই বিজ্ঞ ব্যক্তি আমাদের গড/গডের পুত্র । আমাদের গড/গডের পুত্রকে নিয়ে তোমাদের অত গবেষণা করার প্রয়োজন নেই। "
বলতে পারেন এই কাজ করে ওরা বিজ্ঞ ও মহান ব্যক্তিদের নিজেদের সম্পত্তি বানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করত।
গ্রিকরা ইদরীস (আঃ) কে তাদের গড Hermes এর পুত্র বানিয়ে দিয়েছিল। অর্থাৎ এরা বিশ্বাস করত যে Hermes Trismegistus হল তাদের গড Hermes এর পুত্র। ঈসা (আঃ)এর ক্ষেত্রে যে কাজ করা হয়েছিল ঠিক একই কাজও ওরা ইদরীস (আঃ) এর ক্ষেত্রে করেছে , Sabianরাও একই কাজ করে থাকতে পারে।

ইদরীস (আঃ) এর শিষ্যরাও বিকৃতি থেকে রক্ষা পায় নি। যেমন- Asclepious নামে এক শিষ্য ছিল Hermes এর। গ্রিকরা বিশ্বাস করত Asclepious হল তাদের গড Asclepious এর পুত্র।


৩)
" Mathematics is the language of Science"- বিজ্ঞানের ভাষা হল গণিত। গণিত ছাড়া বিজ্ঞান মেরুদন্ডহীন, পংগু আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল Mathematical Logic ছাড়া বিজ্ঞান হল ইনঅ্যাকুরেট ।তাই বিজ্ঞানের জন্ম গণিতের জন্মের সাথেই হয়েছে।গণিতের পূর্বে বিজ্ঞানের জন্ম হওয়া আর মাতার পূর্বে সন্তানের জন্ম হওয়া একই কথা। 
ইদরীস (আঃ ) কে মু'জেযা হিসাবে Astronomy এবং Mathematics দান করা হয়েছিল।
ইমাম কুরতবী (রহিমাহুল্লাহ্‌) এর সূরা মারিয়ামের তাফসীর এবং মা'রেফুল ক্বুরআন থেকে ইদরীস (আঃ) সম্পর্কে জানা যায় যে--
"ইদরীস(আ) হলেন প্রথম মানব , যাঁকে মু'জেযা হিসাবে জ্যোর্তিবিজ্ঞান (Astronomy) এবং অংকবিজ্ঞান (Mathematics) দান করা হয়েছিল।তিনিই সর্বপ্রথম মানব ,যিনি আল্লাহর ইলহাম মতে কলমের সাহায্যে লিখন পদ্ধতি ও বস্ত্র সেলাই শিল্পের সূচনা করেন।তাঁর পূর্বে মানুষ সাধারণতঃ পোশাক হিসাবে জীব জন্তুর চামড়া ব্যবহার করত। ওজন ও পরিমাপের পদ্ধতি আবিষ্কার ও তার ব্যবহার তাঁর আমল থেকেই শুরু হয় ।তিনি অস্ত্র নির্মাণ করে ক্বাবীল গোত্রের বিরুদ্ধে জিহাদ করেন। " [৭]

এই বিষয়ে অনেকেই একমত যে , ইদরীস(আঃ) -ই প্রথম লেখার পদ্ধতি প্রবর্তন করেছিলেন। আর মানুষ জানতে পেরেছে যে মেসোপটেমিয়ার সুমেরিয়ানরা প্রথম লেখার সূচনা করেছিল আর এই পদ্ধতিই সম্ভবত ইদরীস (আঃ) লেখ্য পদ্ধতির বিকৃত কিংবা অবিকৃতরূপ।


 তাছাড়া ইদরীস(আঃ)/Hermes জোর্তিবিদ্যার সাহায্যে রেখা টানতে দক্ষ ছিলেন। আর এই রেখা টানার বিষয়টা Geometryর সাথে সম্পর্কিত। 


ইবনেকাসীর (রহিমাহুল্লাহ্‌ ) এর আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া বইতে তিনি লিখেছিলেন- 


" ইবন ইসহাক (র) বলেন , ইনিই সর্বপ্রথম কলম দ্বারা লেখার সূচনা করেন।... কেউ কেউ বলেন ,মু'আবিয়া ইবন হাকাম সুলামী-এর হাদীসে এ ইদরীস (আ)-এর প্রতিই ইংগিত করা হয়েছে যে , রসূলুল্লাহ্‌(সঃ)-কে জ্যোতির্বিদ্যা (Astronomy) সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছিলেন, একজন নবী ছিলেন যিনি এ বিদ্যার সাহায্যে রেখা টানতেন।সুতরাং যার রেখা চিহ্নতাঁর রেখা চিহ্নের অনুরূপ হবে তাঁরটা সঠিক। বেশ কিছু তাফসীরকার মনে করেন যে,ইদরীস (আ)-ই প্রথম ব্যক্তি যিনি এ বিষয়ে আলোকপাত করেছেন।" [৮]

Hermes Trismegistus এর শিক্ষার মধ্যে Mathematics ছিল অন্যতম। এই কারণেই মিশরে বাঘা বাঘাGeometrician এর জন্ম হয়েছিল।
কিন্তু মিশরীয়রা জ্যামিতির প্রাক্টিক্যাল ব্যবহার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল ,ফলে থিওরেটিক্যাল জ্যামিতি ধীরে ধীরে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যেতে লাগল।[৯]  পিরামিড হল এই প্রাক্টিক্যাল জ্যামিতির উদাহরণ।


ইদরীস(আঃ) এর বৈজ্ঞানিক চিন্তা-ভাবনা পুস্তিকা আকারে ছিল আর এই পুস্তিকাগুলোর কারণেই আমরা মিশরের পিরামিড দেখতে পারছি। The Secret Teachings of All Ages বইয়ের লেখক Manly P. Hall এই বিষয়ে লিখেছিলেন-
“By the Egyptians the Great Pyramid was associated with Hermes, the god of wisdom and letters and the Divine Illuminator worshiped through the planet Mercury.” [১০]


Mysticist Edgar Cayce বলেছিলেন যে Hermes ছিলেন আটলান্টিসের একজন ইঞ্জিনিয়ার যিনি পিরামিড ডিজাইন ও নির্মাণ করেছিলেন।[১১]
পক্ষান্তরে গ্রিকরা থিওরেটিক্যাল চিন্তা করতে পছন্দ করত।গ্রিক গণিতবিদ পিথাগোরাস মিশরীয়দের কাছ থেকে জ্যামিতির শিক্ষা লাভ করে।এরপর জন্ম নেয় পিথাগোরাসের বিখ্যাত উপপাদ্য- কোন একটি সমকোণী ত্রিভুজের অতিভূজের উপর অংকিত বর্গক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল ঐ ত্রিভুজের অপর দুই বাহুর উপর অংকিত বর্গক্ষেত্রদ্বয়ের ক্ষেত্রফলের সমষ্টির সমান ( a^2+b^2=c^2)। পিথাগোরাসের এই উপপাদ্যটি অসাধারণভাবে প্রমাণ করেছিলেন আরেক গণিতবিদ ইউক্লিড। ইউক্লিড আবার মিশরের Alexandriaয়  শিক্ষকতা করত। যেভাবেই দেখেন না কেন বিজ্ঞানের শুরুর ইতিহাস আপনাকে মেসোপটেমিয়াতেই নিয়ে যাবে কারণ Hermes বা ইদরীস (আঃ) এর কারণেই মিশরে এই বিদ্যার আগমন হয়েছিল এবং জন্ম হয়েছিল বিজ্ঞানের।


৪)


ইদরীস (আঃ)এর লেখাগুলো যে কতটা শক্তিশালী ছিল তা এখনো Corpus Hermeticum পড়লে বুঝা যায় যদিও এই বইটা বিকৃত হয়ে গিয়েছে। 
আমার কাছে Corpus Hermeticum এর ইংরেজী অনুবাদটা আছে, ভাবিনি বইটা এত গভীর পর্যায়ের হবে। যদি আপনার ইসলামী আক্বীদাগত জ্ঞান একেবারেই কম থাকে তাহলে এটা পড়ার দরকার নাই।কারণ এই বইটা হল ক্বুরআনে বর্ণিত Sabianদের ধর্মের নতুনরূপ Hermeticism ধর্মের ধর্মগ্রন্থ।
ইদরীস (আঃ) এর লেখার শক্তি সম্পর্কে একটু ধারণা দেয়ার প্রয়োজন বোধ করছি।তাঁর লেখার অনেকটাই হয়তো বিকৃত হয়ে গিয়েছে তারপরো তাঁর লেখার শক্তি অনুভব করা সম্ভব। 
 Corpus Hermeticum এ জ্ঞান-বিজ্ঞানের কথা কিছুটা ধাঁধার মত করে দেয়া হয়েছে । উপমার সাহায্যে এবং পরোক্ষভাবেও অনেক কথা বলা হয়েছে, বিজ্ঞানের অনেক বিষয় সম্পর্কে অল্প-স্বল্প Hintও দেয়া হয়েছে ।
তাই এই বই নিয়ে গবেষণা করে যারা বড়বড় বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার করেছেন তারা এই বই থেকে নিংড়িয়ে তথ্য বের করেছেন। জাবির ইবন হাইয়্যান , কোপার্নিকাস, ব্রুনো ,কেপলার , নিউটন এরা সবাই এই বই থেকে তথ্যগুলো নিংড়ে বের করেছেন। তার মানে এই না যে এই বইয়ের Puzzle টাইপের কথাগুলো সব  অর্থ উদ্ধার করা হয়েছে।
ধাঁধার একটা বৈশিষ্ট্য হল যে ধাঁধা সমাধান করার জন্য একজন ব্যক্তিকে পারিপার্শ্বিক বিষয়গুলো সম্পর্কে ভাল জ্ঞান রাখতে হবে।এছাড়া এমন ধাঁধাও আছে যা কিনা পাঠককে ভুল সমাধানের দিকে ঠেলে দেয়।একটা সহজ এবং কমন ধাঁধার উদাহরণ দেই--
"লুসির মায়ের তিন সন্তান ,একজনের নাম হল এপ্রিল আরেকজন হল মে। ৩য় সন্তানের নাম কি?"
যারা এই ধাঁধাটা প্রথম দেখছেন তাদের ব্রেনে চট করে 'জুন'নামটা চলে আসবে। কারণ ব্রেন শর্টকার্ট নিতে পছন্দ করে আর ধাঁধাটাও উত্তরদাতার ব্রেনকে শর্টকার্ট পদ্ধতিতে যেতে ফোর্স করছে এবং ভুল উত্তর দিতে প্ররোচিত করছে ।কিন্তু যখন উত্তরদাতা আরেকটু চিন্তা করবে তখন সে বুঝবে যে ধাঁধার উত্তর ধাঁধাতেই দেয়া আছে যেটা হল 'লুসি'।
এখন এই ধাঁধাটা আমি বাংলায় জিজ্ঞেস করলে আপনার ব্রেন এই ডাটা এনালাইস করতে কম সময় নিবে আবার আমি যদি এটা ইংরেজীতে করতাম তাহলে দেখা যেত একই ডাটাকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করারফলে আপনার ব্রেন ডাটাকে এনালাইস করতে সময় বেশি নিচ্ছে।
এই ধাঁধাটি পাঠককে শুধুমাত্র একটা ভুল উত্তরে যেতে ফোর্স করছে ।এখন কোন ধাঁধা যদি একাধিক ভুল উত্তরের দিকে যেতে ফোর্স করে এবং সাথে সাথে সেই ধাঁধার ভাষাটাও যদি অরিজিনাল থেকে বিকৃত হয় তাহলে সেটা সমাধান করতে অনেক কষ্ট হবে এবং নিউটন , কোপার্নিকাস , ব্রুনোদের মত মাথার প্রয়োজন হবে।


যেহেতু Corpus Hermeticum বিকৃত বই তার উপর ধাঁধাগুলো কিংবা উপমাগুলো যদি জটিল হয় তাহলে এই বইয়ের তথ্যগুলো Decode করতে অনেক কষ্ট করতে হবে। অনেকে তো Decoding করতে গিয়ে Corpus Hermeticum এর তাফসীরও লিখেছেন।নিউটনও Emerald Tablet এর তাফসীর লিখেছিলেন।
এখন আমি Hermetic Text একটা উদাহরণ দিচ্ছি।
প্রথমটা হল-- The Corpus Hermeticum এর Book 2 এর প্রথম অনুচ্ছেদ যেখানেHermes তাঁর শিষ্য Asclepious এর সাথে Astronomy সম্পর্কে আলোচনা করছেন। এখানে বলা হয়েছে--
H (Hermes) :- Is not everything that is moved , O Asclepius , moved in something and by something ?
A (Asclepious) :- Certainly.
H (Hermes) :- Must not that in which something is moved be greater than what is moved?
A :- It must.
H (Hermes) :- Must not the mover be more powerful than the moved ?
A:- Definitely more powerful.
H:- And Must not that in which movement occurs have a nature opposite to that of the moved?
A:- Yes, Indeed. [১২]
এই অনুচ্ছেদে Planetory Motion এর কথা বলা হয়েছে। সূর্য যে গ্রহগুলোকে ঘুরাচ্ছে সেটাই বলা হয়েছে। বেশি কিছু বলছি না, শুধু বলব ভারি বস্তুর Gravitional Pull হালকা বস্তুর থেকে বেশি। আর সূর্য পৃথিবীর থেকে 300,000 গুণ ভারি।এখন আবার আমরা জানতে পেরেছি যে আমাদের সোলার সিস্টেমও 225-250 million সময় নেয় বিশাল  বড় Milky Way গ্যালাক্সিকে পরিভ্রমণ করতে। 
নিউটন এই রকম ব্যাখ্যাই দিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে এই ব্যাখ্যার কারণে তাকে Bentley Paradox এর সম্মুখীন হতে হয়েছিল।[১৩]

•৫)
ইউরোপের বিজ্ঞান বিপ্লবে যে  দুইজন ব্যক্তির ভূমিকা অবর্ণণীয় তাদের  একজন হলেন Copernicus আরেকজন হলেন Giordano Bruno। কোপার্নিকাস ও ব্রুনোকে মুক্তচিন্তার প্রতীক বলে অনেকে বিবেচনা করে। কোপার্নিকাসও ব্রুনো দুইজনই বাইবেলের Geocentric Theory (পৃথিবীকেন্দ্রিক সৌরজগৎ) এর বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন এবং Heliocentric Theory (সূর্যকেন্দ্রিক সৌরজগৎ) কে উপস্থাপন করেছিলেন।
ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলায় এই দুইজনকে নাস্তিক ও Agnostic (অজ্ঞেয়বাদী)রা খুবই শ্রদ্ধার চোখে দেখে,এই দুইজন ছাড়া গ্যালিলিওকেও এরা শ্রদ্ধার চোখে দেখে। এই তিনজনের কথা উল্লেখ করে নাস্তিকরা ও Agnosticরা প্রায়ই বলে যে " ধর্মের সাথে বিজ্ঞান সাংঘর্ষিক , বিজ্ঞানও ধর্ম আলাদা বিষয়" ।
আসলে নাস্তিক ও Agnostic রা ব্রুনো , গ্যালিলিওর ,কোপার্নিকাসের ধর্মবিরোধী কর্মকান্ডের কথা জোরে-শোরে প্রচার করলেও তাদের সম্পর্কে অনেক কথাইএরা সহজে বলে না। ব্রুনো , গ্যালিলিওদের বিজ্ঞানের প্রতি ভালবাসা সৃষ্টির পিছনে যে Hermes Trimegistus নামের একজন ধর্মীয় গুরু ছিলেন সে কথা এরা মুখেই আনে না। আমার তো মনে হয় এরা জানেই না এই ব্যাপারে! জানলে নিলর্জ্জও বেহায়ার মত ধর্মের বিরুদ্ধে বিজ্ঞানের অবস্থান প্রমাণ করতে এই ব্যক্তিদের উদাহরণ এরা ব্যবহার করত না।
এখন দেখি কিভাবে কোপার্নিকাসও ব্রুনো Hermes বা ইদরীস (আঃ) এর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন ।
ইউরোপের বিজ্ঞান বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল কোপার্নিকাসের লেখনী দ্বারা। কোপার্নিকাস তার On the Revolutions of the celestial spheres বইতে প্রথম Heliocentric Theory প্রকাশ করেছিলেন। ক্যাথলিক চার্চ যে শিকল দিয়ে বৈজ্ঞানিক চিন্তা-ভাবনাকে বন্দী করে রেখেছিল সে শিকলে প্রথম জোরালো আঘাত হানে কোপার্নিকাসের এই বইটা।
মূর্খ নাস্তিকের দল কোপার্নিকাসকে নিয়ে বাহাদুরি করলেও কোপার্নিকাস মূলত Hermes এর সাহায্য নিয়েই তার থিওরিটা তৈরী করেছিলেন। তিনি তো তার On the Revolutions of the celestial spheres বইতে Hermes Trimegistus এর কথা সরাসরি উল্লেখ করেছিলেন। এই বইতে কোপার্নিকাস বলেছিলেন--

" Accordingly (considering the sun's central position) , it is not foolish that it has been called the lamp of universe , or its mind , or its ruler . (It is ) Trismegistus' visible God... " [১৪]

ধর্মবিরোধীরা কোপার্নিকাসের থেকে বেশি মাতামাতি করে ব্রুনোকে নিয়ে কারণ ব্রুনো ইতিহাসের সেরা খ্রিস্টান বিরোধীছিল। কিন্তু তার মানে এই না যে ব্রুনো নাস্তিক ছিল কিংবা সে অন্য কোন ধর্মের অনুসারী ছিল না। ব্রুনো একজন কট্টর Hermeticist ছিল এবং সে Hemeticism ধর্মের প্রচারক হিসেবে বিখ্যাত ছিলেন।
ব্রুনোর বিখ্যাত বই " On the infinite universe and worlds " এ ব্রুনো "Infinite Universe Theoryর" কথা বলেছিলেন ।ব্রুনো এই থিওরিটা প্রস্তুত করেছিলেন Hermes এর " Asclepius " বইয়ের সাহায্য নিয়ে।[১৫]

Hermes এর প্রতি ব্রুনোর এতটাই ভালবাসা ছিল যে ব্রুনো Giordanisti নামে একটা গুপ্তসংঘ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই গুপ্তসংঘের উদ্দেশ্য ছিল Hermeticism এরপ্রচার করা এবং এটা প্রতিষ্ঠা করা। ব্রুনো বিশ্বাস করত যে খ্রিস্টান ধর্ম হল একটা বিকৃত ধর্ম , Hermes এরধর্মকেই সে সত্য বলে বিশ্বাস করত। তার প্রতিষ্ঠিত এই সংঘের সদস্যরাও এই মতে বিশ্বাসী ছিলেন , হয়তো এই সংগঠন এখনো আছে কিংবা অনেক আগেই এর বিলুপ্তি ঘটেছে।
অনেকেই মনে করেন যে Heliocentric Theory প্রচারের দায়ে ব্রুনোকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছিল কিন্তু সত্য কথা হল Hemeticism প্রচার করার দায়েই তাকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছিল। এই ভুল তথ্যের কারণে অনেকে ব্রুনোকে বলে 'Martyr for Science' অথচ ব্রুনোকে বলা উচিত 'Martyr for Hemeticism ' । তাই অবাক লাগে যখন দেখি নাস্তিকরা ব্রুনোর উদাহরণ দিয়ে ধর্মকে পচায় এবং প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে বিজ্ঞানের সাথে আস্তিকতা সাংঘর্ষিক।



•৬)
আধুনিক বিজ্ঞানের শুরুটা যাদের হাতে হয়েছিল তারাও Hermeticims দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন।তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলে গ্যালিলিও ও নিউটন।

গ্যালিলিও গ্যালিলাই :-
The Father of Modern Science , গ্যালিলিও গ্যালিলাই ১৫৬৪ সালে ইতালির পিসাতে জন্মেছিলেন। আধুনিক বিজ্ঞানে গ্যালিলিওর অবদান অনেক। গ্যালিলিও বিজ্ঞানের Experimentation পদ্ধতির প্রচার করেছিলেন এবং তার পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ দ্বারাই পরবর্তীতে বিজ্ঞান জগতে Experimentation Method এর আগমন ঘটে। গ্যালিলিও হাইপোথিসিসের উপর Experiment করে সেই হাইপোথিসিসকে কিভাবে শক্তিশালী করতে হয় সেটা দেখিয়েছিলেন।
গ্যালিলিওর যুগে কোপার্নিকাস এর Heliocentric Theory হাইপোথিটিক্যাল স্টেজে ছিল।কোপার্নিকাসের থিওরিকে প্রথম পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করেন গ্যালিলিও।টেলিস্কোপের দ্বারা সৌরজগত পর্যবেক্ষণ করে তিনি কোপার্নিকাসের থিওরির সত্যতা প্রমাণ করেন। মূলত গ্যালিলিও Hermes Trismegistus এর এই কথাটাকে প্রমাণ করেছিলেন--
"For the sun is situated at the centre of the cosmos, wearing it like a crown."  [১৬]

হ্যাঁ এটা সত্য যে গ্যালিলিও সরাসরি Hermes এর কথা উল্লেখ করেনি যেমনটা ব্রুনো,কোপার্নিকাস ও নিউটন করেছেন। এর কারণও আছে। ১৬০০ সালে গ্যালিলিওর বয়স যখন ৩৬ ছিল তখন ব্রুনোকে পাবলিকলি আগুনে পুড়িয়ে মারা হয় । চার্চ পাবলিকলি এই কাজ করেছিল যাতে কোন ফিলোসফার কিংবা বিজ্ঞানী ব্রুনোর মত কথাবার্তা না বলে। অর্থাৎ ব্রুনোর মৃত্যুর পর Hermesকে নিয়ে কথা-বার্তা বলা একেবারে ট্যাবু হয়ে যায়।
এইজন্য ব্রুনোর দ্বারা ইন্সপার্য়াড হওয়া সত্ত্বেও গ্যালিলিও তার প্রথম বইয়ে ব্রুনোর নাম উল্লেখ করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেনি আর এই কারণে কেপলার গ্যালিলিওর সমালোচনাও করেছিলেন।
গ্যালিলিও যে ব্রুনোর দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন সেটা গ্যালিলিওর Dialogue Concerning the Two Chief World Systems বইটা দেখলে বুঝা যায় । এই বইটার সাথে ব্রুনোর The Ash Wenesdayর মিল আছে। আর গ্যালিলিও তার এই বইয়ের কারণেই চার্চের ক্রোধের মুখে পড়েন।
এছাড়া গ্যালিলিও Hermeticistদের উঠা-বসা করত , একজনের সাথে তো খুবই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল ।সে ব্যক্তির নাম হল Giovanni Domenico Campanella । Campanella ও ব্রুনো একই পথের পথিক ছিলেন । তাই এই দুইজনের দ্বারা প্রভাবিত ব্যক্তি Hermetica সম্পর্কে অবশ্যই ভালভাবে জেনেছিলেন। গ্যালিলিও এর ব্যতিক্রম নয়।
ব্রুনো যখন Giordanisti নামের গুপ্ত সংঘ প্রতিষ্ঠা করে জোরেশোরে Hermeticism প্রচার করছিল তখন গ্যালিলিও ব্রুনোর এই কাজ প্রত্যক্ষ করেছিলেন। প্রশ্ন হল- গ্যালিলিও কি এই সংগঠনের সদস্য ছিলেন? ড্যান ব্রাউনের "Angels and Demons" বইতে ব্রাউন গ্যালিলিওকে 'Illuminati' সদস্য বলেছেন কিন্তু এটা ভুল তথ্য।এই কারণে ব্রাউনের "Angelsand Demons" বইটা সমালোচিত হয়েছিল। The Da vinci code বইটাও হিস্টোরিকাল একুরেসির অভাবে সমালোচিত হয়েছিল।
তবে হ্যাঁ ব্রাউন যদি 'Illuminati'র বদলে 'Giordanisti'র কথা বলত তাহলে হয়ত তার বই সমালোচনা এড়াতে পারত কারণ গ্যালিলিওর যুগে 'Giordanisti'র অস্তিত্বছিল , 'Illuminati'র ছিলনা।
গ্যালিলিওর 'Giordanisti'র সদস্য হওয়ার পক্ষে তেমন কোন শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায় না । কিন্তু এটা সত্য যে গ্যালিলিও ব্রুনোর চিন্তা-ভাবনা দ্বারা তীব্রভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন যা কিনা ইউরোপের বিজ্ঞান বিপ্লবের ক্ষেত্রে Hermes এর কৃতিত্বকেই স্বীকৃতি দেয়।
স্যার আইজাক নিউটন :-
গ্যালিলিওর মৃত্যুর সালেই (১৬৪২) ইংল্যান্ডে জন্ম গ্রহণ করেন আইজাক নিউটন। । কৃষকের ছেলে হওয়ায় অনেকেই ভেবেছিলেন যে নিউটনও কৃষকই হবেন কিন্তু ক্যামব্রিজড থেকে পাশ করা নিউটনের এক আংকেল তাকে এক স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন।এর মাধ্যমে জ্ঞানের পথে যাত্রা শুরু হয় নিউটনের।
Trinity College এ পড়াশুনা করলেও নিউটন খ্রিস্টানদের 'ট্রিনিটি'তে বিশ্বাস করতেন না ।ব্রুনোর মত নিউটনও বুঝতে পেরেছিলেন যে খ্রিস্টান ধর্মকে বিকৃত করে ফেলা হয়েছে। এইজন্য হয়তো অন্যান্য ফিলোসফির প্রতি নিউটনের বেশি আগ্রহ ছিল।
Alchemyর প্রতি নিউটনের অনেক বেশি আগ্রহ ছিল ।Alchemy কে বিজ্ঞান থেকে বিচ্যুত শাখা বলে গণ্য করা হয়। কারণ Alchemyতে কেমিস্ট্রির আলোচনার সাথে সাথে ম্যাজিক নিয়েও অনেক আলোচনা আছে। Alchemy নিয়ে গবেষণা করার জন্য Alchemistদের "Divine Scripture"গুলো ঘাটতে হত । নিউটনও এর ব্যতিক্রম ছিলেননা।
নিউটনের মৃত্যুর পর নিউটনের পারসোনাল লাইব্রেরিতে Alchemyকে নিয়ে লেখা ১৬৯টি বই পাওয়া গিয়েছিল। নিউটনও Alchemyর উপর অনেক লেখা লিখেছিলেন। ইংল্যান্ডের জন্য লজ্জার বিষয় হল যে নিউটনের এই লেখাগুলো ইহুদিদের "Jerusalem National Library" তে আছে।নিউটনের এই লেখাগুলো সাংকেতিকভাবে লেখা যার সবগুলো এখনো Decode করা সম্ভব হয় না বরং এখনো হয়তো Decoding এর কাজ চলছে।
নিউটন ইংল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করায় Hermesএর নাম উল্লেখ করতে তিনি দ্বিধান্বিত হননি । নিউটন তার Alchemical লেখাগুলো Hermes এর নাম প্রায়ই উল্লেখ করেছেন। এমনকি নিউটন Hermes এর"Emerald Tablet" এর ব্যাখ্যাও লিখেছেন ।(গুগলে সার্চ দিলে পাবেন।)
নিউটন যে Hermeticism দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন তা 1966 সালে জনসম্মুখে তুলে আনেন "Leeds University"র দুইজন লেকচারার 'J.Edward McGuire' এবং'Piyo M. Rattansi' ।  
Indiana Universityর প্রফেসর Richard Westfall নিউটনের Hermeticism সম্পর্কে বলেছেন--

"In Newton , peculiarly Hermetic notions fostered the crucial development of his scientific thought." [১৭]

নিউটন তার বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের জন্য Corpus Hermeticum এর সাহায্য নিয়েছিলেন- এটা সত্য কিন্তু তার মানে এই না যে নিউটন বুদ্ধিমান ছিলেন না। তিনি অবশ্যই একজন Genius ছিলেন কারণ Hermetica থেকে তথ্য নিংড়ে বের করার জন্যও ইন্টিলেকচুয়াল পাওয়ার ভাল থাকতে হয় ।
•৭)
Hermetica সম্পর্কে লেখিকা Lynn Picknett  বলেছিলেন-

" It is universally acknowledged that if the Principia (Newton's book) had never been written , our modern technological  world would not exist. But without the Hermetica , Newton would never have written the Principia." [১৮]


 Hermeticaর জন্যই যে  বিজ্ঞানের জন্ম হয়েছে তা Hermetica  থেকে অন্যান্য যেসব আবিষ্কার হয়েছে তার একটা ছোটলিস্ট দেখলেই বুঝা যেতে পারে। Lynn Picnett এর The Forbidden Universe: The origins of science and the search for the mind of God বইটাতে এইরকম একটা লিস্ট আছে।আমি শুধু লিস্টে উল্লেখিত আবিষ্কারগুলোর কথা লিখছি এখানে যা কিনা ইউরোপের বিজ্ঞান বিপ্লব ঘটিয়েছিল-- 

*The Heliocentric Theory
*The laws of planetary motion
*The concept of an infinite universe
* The idea of other solar systems containing habitable planets
*The theory of gravity
*The Newtonian laws of motions
*The circulation of blood
*The Earth's Magnetism
*The basic principles of information theory and the basic principles of computer science

•৮)
শুধুমাত্র থিওরি ও হাইপোথিসিসের দ্বারাই বিজ্ঞানের জগৎ সৃষ্টি হয় নি। গুটি কয়েক থিওরি ও হাইপোথিসিস সম্পর্কে জানলেই বিজ্ঞান বুঝা যায় না। বিজ্ঞান সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেতে হলে বিজ্ঞানের ইতিহাস, Philosophy of Science সম্পর্কে জানতে হবে, কিভাবে থিসিস ও হাইপোথিসিসের সৃষ্টি হয় তা বুঝতে হবে, বুঝতে হবে "Inductive ও Abductive Inference"।
যারা বিজ্ঞানের সাহায্যে ধর্মকে পচাতে চায় তাদের প্রায় সবাই এইসব বিষয় সম্পর্কে জানে না , জানলেও জানে অস্পষ্টভাবে।


এটাও মনে রাখা উচিত যে শুধুমাত্র মানুষের জানার আগ্রহ থেকে বিজ্ঞানের সৃষ্টি হয়নি ,জানার আগ্রহ  বিজ্ঞানের উন্নতি সাধন করেছে মাত্র এবং এখনো করছে। প্রকৃতপক্ষে বিজ্ঞান এসেছে আল্লাহ্‌ তাআলার ইচ্ছায়। তিনি আমাদেরকে জানাতে চেয়েছেন বলেই আমরা জানতে পেরেছে।বিজ্ঞানের ভাষা Mathematics নিয়ে একটু চিন্তা করলেই বুঝতে পারবেন যে Mathematics এর বেসিক বিষয়গুলো মানুষের দ্বারা আবিষ্কার করা সম্ভব না। প্রকৃতিতে আমরা যে Rational Order দেখতে পাচ্ছি তা আল্লাহ্‌ তাআলার সৃষ্টি এবং এই Rational Orderকে প্রকাশ করতেই গণিতের আগমন। Johannes Kepler মোটেও ভুল বলেন নি যে-


“The chief aim of all investigations of the external world should be to discover the rational order which has been imposed on it by God, and which he revealed to us in the language of mathematics.” [১৯]


অনেক ভাই বিজ্ঞানকে খুব তুচ্ছ দৃষ্টিতে দেখে কারণ বিজ্ঞানের জগতকে এখন লিড দিচ্ছে সেকুলার Agnosticরা । যারা বিজ্ঞানকে তুচ্ছভাবে দেখেন তাদেরকে বলব , বিজ্ঞান সেকুলার ও নাস্তিকদের পৈত্রিক সম্পত্তি না। আল্লাহ্ তাআলার সৃষ্টি সম্পর্কে জানার অধিকার সবারই আছে। বিজ্ঞান জানতে গেলে আপনাকে নাস্তিকবা এগনোস্টিক হওয়া লাগবে বিষয়টা এমন না। বরং যেসব মূর্খ বলে
"বিজ্ঞান অনুযায়ী স্রষ্টার অস্তিত্ব নেই" তারা বিজ্ঞানের উৎস সম্পর্কেই অজ্ঞ।
একটা কথা মনে রাখবেন, জ্ঞান অর্জন করা খারাপ কোন কাজ না। কিন্তু জ্ঞান অর্জনের সময় আপনি কোন বিষয় সম্পর্কে আগে জ্ঞান অর্জন করতে চান সেটা আপনার জানা দরকার। অবশ্যই ইসলামের প্রাথমিক বিষয়গুলো সম্পর্কেই সবার আগে জানতে হবে যা কিনা আপনাকে দৃঢ়ভাবে ইসলামিক আইডিওলজি ফলো করতে সাহায্য করবে। পৃথিবীর একমাত্র সত্য আদর্শের অনুসারী হতে পারলে আপনি যেকোন বিষয় সম্পর্কেই একটা বিশুদ্ধ ধারণা পাবেন এবং বিভ্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষা পাবেন।


বিজ্ঞানের প্রকৃত উৎস নিয়ে আলোচনা করছি কারণ এটা আমাদের জানা প্রয়োজন। নাস্তিকও সংশয়বাদীরা (সবাই না) বিজ্ঞানকে ব্যবহার করছে স্রষ্টার অস্তিত্বকে অস্বীকার করতে , তারা মানুষকে বিভ্রান্ত করতে বিজ্ঞানকে ব্যবহার করছে অথচ বিজ্ঞানের বেসিক বিষয়গুলোর উৎসই হল Divine (আসমানী) যা মহান আল্লাহ্‌ আমাদের শিখিয়েছেন।
স্রষ্টার অস্তিত্বকে অস্বীকার করতে গিয়ে বিজ্ঞানকে টেনে আনা বোকামি ছাড়া আর কিছুই না।


তথ্যসূত্র :-


[১] Chemical Evolution, Oxford,Clarendon Press, 1969, p. 258


[২] http://www.anninevandermeer.nl/html/artikelen/harran_of_the_sabians.htm


[৩] Prophets in the Quran by Ibn Qasir (Rahimahullah)


[৪]The Wisdom of the Egyptians by Brian Brown,Chapter-The Vision of Hermes


[৫] http://alchemylab.com/AJ3-4.htm


[৬]The Archive Of Hor by J.D Ray ,p-65


[৭] নবীদের কাহিনী ,লেখক-আসাদুল্লাহ্‌ আলগালিব, পৃ-৭৫


[৮] আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া-ইবনে কাসীর (রহ),পৃ-২২৭


[৯] A meaningful World by Benjamin Wiker



[১০] The Secret Teachings of All Ages by
Manly P. Hall


[১১] http://www.crystalinks.com/hermes_trismegistus.html

[১২] The Way of Hermes: New Translations of The Corpus Hermeticum and The Definitions of Hermes Trismegistus to Asclepius by Clement Salaman



[১৩]Physics of the Impossible by Dr. Michio Kaku


[১৪] On the Revolutions of the celestial spheres by Copernicus,p-31
                                                                       
[১৫] The Forbidden Universe: The origins of science and the search for the mind of God by Lynn Picknett


[১৬] Corpus Hermeticum, Treatis XVI ]


[১৭] Newton and Hermetic Tradition by Richard West fall , Page-185-6


[১৮] The Forbidden Universe: The origins of science and the search for the mind of God by Lynn Picknett , Chapter-06


[১৯] Mathematics:The
The Loss of Certainty , p. 31.)

খ্রিস্টান ধর্ম কি ঈসা (আঃ) কর্তৃক আনিত ধর্ম ?

সূচীপত্র -

১l খৃষ্টান জাতীর অবস্থা
২l ইঞ্ছিল বা বাইবেল প্রসঙ্গ
৩l ইঞ্জিল বারবানাস
৪l বারবানাস কে ছিলেন 
৫l শেষ কথা













                                                                                         খৃষ্টান জাতীর অবস্থা

খ্রিষ্টিয় ধর্ম বলতে হযরত ঈসা (আঃ) কর্তৃক আনিত ধর্ম নয়,বরং ঈসা (আঃ)-এর বলে যাকে মনে করা হয় তাই । বর্তমান খ্রিষ্টবাদের শিক্ষা যে হযরত ঈসা (আঃ) দেননি সে সম্পর্কে অকাট্য প্রমান বিদ্যমান রয়েছে । প্রকৃত পক্ষে ঈসা (আঃ) মানব জাতীর কাছে সেই ইসলামই উপস্থাপন করেছিলেন,যা তার পূরবে সমস্ত নবী ও রাসূলগন উপস্থাপন করেছিলেন এবং তার পরে বিশ্ব নবী (সাঃ) উপস্থাপিত করেছিলেন ।


বর্তমানে খ্রিষ্ট ধর্ম বলতে যা উপস্থিত রয়েছে তা হযরত ঈসা (আঃ)-এর প্রচারিত খোদায়ি জীবন ব্যাবস্থা নয় বরং হযরত ঈসা (আঃ)-এর নামে পাদ্রিদের মনগড়া মতবাদ । ষষ্ঠ শতাব্দিতে খ্রিষ্টান জাতীর অবস্থা মোটেও ভাল ছিল না । অত্যন্ত শোচনীয় ছিল তাদের অবস্থা । হযরত ঈসা (আঃ)-এর শিক্ষা ও আদর্শ পাদ্রিদের হাতে এমন ভাবে বিকৃত হয়ে পড়েছিল যে , সয়ং ঈসা (আঃ) ফিরে এলেও প্রচারিত আদর্শকে নিজের বলে চিনতে পারতেন না ।


হযরত ঈসা (আঃ)-এর তাওহীদবাদি আদর্শকে ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ ত্রিতত্ববাদে পরিনত করেছিল । যে ঈসা (আঃ) পৃথিবীতে এসেছিলেন মুর্তি ধ্বংস করার জন্যে , খ্রিষ্টানরা সেই ঈসার মূর্তি বানিয়েই পূজা শুরু করে দিল । সেই সাথে তার মা মেরিও {মরিয়ম (আ)} ঈশ্বরের এক তৃতীয়াংশরূপে সর্বত্র পূজিত হতে লাগল । শুধু কি তাই ? সেন্ট পল ও পিটারের মূর্তি বানিয়েও পূজা শুরূ হল ! গোটা জীবন ধরে যে যত পাপই করুক না কেন , ত্রানকর্তা যিশুকে একবার পূজা করলেই সমস্ত পাপ ধুয়ে মুছে যাবে - এই মতবাদ সমস্ত খ্রিষ্টানদের মন ও মগজে প্রতিষ্ঠিত করে দেওয়া হল ।


এরপর 'Holy Roman Empire' নামে পৃথক একটি খ্রিষ্টান জগৎ প্রতিষ্ঠিত করা হল ।রোমের পোপের হাতে খ্রিষ্টানদের যাবতিয় ধর্ম সংক্রান্ত অপরাধের বিচারের দায়িত্ব অর্পন করা হল । এর পর ধর্মের দোহাই দিয়ে পোপ-পার্দিরা যে বীভৎস লীলাখেলা শুরু করেছিল , ইতিহাসের পৃষ্ঠা সে সব ঘৃন্য ঘটনায় আজও কলংকিত হয়ে আছে ।


পোপ-পার্দিগন ঘোষনা করেছিল - বেহেস্তের চাবি একমাত্র তাদেরই হাতে । যে যতবড় পাপই করুক না কেন , পোপকে উপযুক্ত মূল্যদান করলে তার আর কোন ভয় থাকবে না । তাকে বেহেস্তে যাবার পাস্পোর্ট দিয়ে দেয়া হবে ।


এই ঘোষনার ফলে গোটা খ্রিষ্টান জগতে পাপ-অন্যায়-অনাচারের প্লাবন বয়ে গিয়েছিল , অন্য জাতীর ইতিহাসে তার উপমা নেই । ঐ ঘৃন্য ঘোষনার ফলে আজও গোটা খ্রিষ্ট পৃথিবী পাপ পংকিলতার অতল তলে নিমজ্জিত হয়ে আছে । প্রকৃত অর্থে তাদের কাছে ধর্ম বলতে যা আছে তা হযরত ঈসা (আঃ) - এর শিক্ষা নয় ।



ইঞ্ছিল বা বাইবেল প্রসঙ্গ


বর্তমানে ইঞ্জিল বা বাইবেল যেটা,তা প্রধানত ৪ টি গ্রন্থের সমষ্টিঃ ১.লুক । ২.মার্ক । ৩.মথি । ৪.যোহন । কিন্তু এই ৪ টা কিতাবের কোনটাই ঈসা (আঃ)-এর নয় । তার উপরে নাযিলকৃত ওহি একত্রে পাওয়া যায়না । হযরত ঈসা (আঃ) ভ্রমনকালে বিভিন্ন স্থানে যে সব উপদেশ দিয়েছেন সেগুলো স্বয়ং তার ভাষা নয় । বর্তমানে যা আছে তা যেমন আল্লাহ'র বাণী নয় তেমনি ঈসা (আঃ)-এর বাণীও নয় । এগুলো আসলে ঈসা (আঃ)-এর শিষ্যদের বরং তস্য শিষ্যদের লিখিত গ্রন্থ । তারা তাদের জ্ঞানের পরিধি অনুসারে ঈসা (আঃ)-এর জীবনি,ইতিহাস এবং বাণী সমূহ লিখেছেন । মথি নামে যে গ্রন্থ রয়েছে তা স্বয়ং মথির লেখা যে নয়,তা ঐতিহাসীক ভাবে প্রমানীত । মথির আসল গ্রন্থ লেজিয়া বহু পূর্বেই গায়েব হয়ে গেছে ।


মথির নামে যে পুস্তক আছে তা যে কার লেখা তা জানার কোন উপায়ই পার্দিরা রাখেনি । স্বয়ং মথির নামের জায়গায় একজন অপরিচিত লোকের নামের মত উল্লেখ করা হয়েছে । মথি ৯ম অধ্যায়ে বলা হয়েছেঃ ইয়াসু সেখান থেকে সামনে অগ্রসর হয়ে মথি নামক একজন ব্যাক্তিকে দেখতে পেলেন ।


মথির রচয়িতা যদি স্বয়ং মথি হতেন তাহলে তিনি এমন করে তার নিজের নাম উল্লেখ করতেন না । মথির গ্রন্থ পাঠ করলে বুঝা যায়,তা মারকাস গ্রন্থ থেকে ধার করা । কারন মারকাস গ্রন্থের মোট আয়াতের সংখ্যা ১০৬৮ টি । এর মধ্যে ৪৭০ টি আয়াতের সাথে মারকাসের বাইবেলের আয়াতের অবিকল মিল আছে রয়েছে । মথির রচয়িতা যদি স্বয়ং মথি হতেন বা হযরত ঈসা (আঃ)-এর সঙ্গি হতেন তাহলে তাহলে অন্য কার লেখা বই থেকে তিনি সংকলন করতেন না । খৃষ্টান গবেষকদের ধারনা,এই গ্রন্থটি ইসার৪১ বছর পরে ৭০ খৃষ্টাব্দে লেখা । আবার কারো কারো ধারনা এটি ৯০ খৃষ্টাব্দে লেখা । যোহন নামে যে বাইবেল রয়েছে তাও হযরত ঈসা (আঃ)-এর সঙ্গি যে যোহন তার লিখা নয় তা বর্তমান খৃষ্টান গবেষকগনই স্বীকৃতি দিয়েছেন । যোহন নামে অন্য কোন লোক এই যোহন কিতাব বানিয়েছে । এই কিতাব ৯০ খৃষ্টাব্দে বা তার আরো পরে রচনা করা হয়েছে । খৃষ্টান গবেষক হ্যারিং বলেছেন এটা ১১০ সালে রচিত ।


মার্ক নামে যে বাইবেল আছে তা মারকাসের বাইবেল বলে স্বীকার করা হয় । কিন্তু মারকাস কোনদিন ঈসা (আঃ)-এর সাথে দেখা করেননি ও তার সঙ্গিও ছিলেন না । কেউ বলেছেন,এই মারকাস যিশুকে ক্রুশে বিদ্ধ করার সময় সেখানে দর্শক হিসাবে উপস্থিত ছিল । কিন্তু এ কথার কোন ভিত্তি নেই ।মারকাস হল সেন্ট পিটির নামক শিষ্যের শিষ্য এবং তার কাছ থেকে তিনি যা শুনেছেন তাই তিনি গ্রিক ভাষায় লিখেছিলেন । এ কারনে খৃষ্টান ধর্ম বিশারদগন তাকে সেন্ট পিটারের বাণীর ব্যাখ্যাতা বলে দাবি করেন ।৬৩ সালে বা ৭০ সালে এই মার্ক গ্রন্থ রচিত হয়েছে বলে ধারনা করা হয় । লুক যে বাইবেল লিখেছেন তার মধ্যেও মারাত্বক বিভ্রান্তি রয়েছে । এই লুক নামক ধর্ম নেতা যে কোন দিন ঈসা (আঃ)-কে দেখেননি এবং তার কথাও কোনদিন শোনেননি তা খৃষ্ট ধর্ম নেতারা এক বাক্যে শিকার করেছেন । লুক ছিলেন সেন্ট পলের শিষ্য এবং তার সাথেই তিনি থাকতেন । লুক যা লিখেছেন তা সেন্ট পলের বানী । স্বয়ং সেন্ট পল বলতেন লুক যে রচনা করেছে তা আমার ।


অথচ মজার বিষয় হল , এই সেন্ট পলও ঈসা (আঃ)-এর সাহচর্য লাভ করেননি । তিনি যিশু খৃষ্ট ক্রুসে বিদ্ধ হবার ৬০ বছর পরে খৃষ্ট ধর্মে দিক্ষীত হন । সূতরাং হযরত ইসা (আঃ) ও লুক এবং সেন্ট পলের এর মধ্যে অনেকগুলো বছরের শুন্যতা রয়ে গেছে ।


লুক নামক এই লোক হযরত ঈসা (আঃ)-এর বাণী কোত্থেকে জুটালো তা গবেষকদের কাছে রহস্যাবৃতই রয়ে গেছে ।তারপরর লুকের বাইবেল ইতিহাসের কোন সময়ে রচিতত তা এখন পর্যন্ত নির্নয় করা যাইনি । কেউ বলেছেন লুক রচিত হয়েছে ৫৭ সালে আবার কেউ বলেছেন ৭৪ সালে । খৃষ্টান গবেষক পোমার,ম্যাকগিফটিং ও হ্যারিং - এর মত বিখ্যাত ব্যাক্তিগন বলেছেন ৮০সালের পূর্ব পর্যন্ত লুক বাইবেল রচিত হয়নি ।


অতএব এই ৪ খানা বাইবেল এর একটাও ঈসা (আঃ) পর্যন্ত পৌছে না । সূতরাং আজ জানারও কোন উপায় নেই যে , হযরত ঈসা (আঃ)কি বলেছেন আর কি বলেননি ! এই ৪ খানা বাইবেলের বর্ননার মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য বিরাজমান । ঈসা (আঃ-এর নীতি ও আদর্শের যা প্রধান ভিত্তি সেই পর্বোতরি উপদেশ গুলি মথি,মারকাস ও লুক তিনজনে তিনভাবে পরস্পর বিরোধি পদ্ধতিতে বর্ননা করেছেন । প্রতিটি গ্রন্থেই লেখকের নিজস্ব ধ্যান-ধারনা ও মনোভাব সুস্পষ্টভাবে অভিব্যাক্ত হয়েছে ।


এসব পাঠ করলে মনে হয় যেন মথির প্রতিপক্ষ একজন ইহুদি এবং সে তার বিতর্কে বিজয় লাভ করতে উদগ্রীব । মারকাসের প্রতিপক্ষ যেন একজন রোমক এবং তাকে তিনি ইসরাইলী ইতিবৃত্ত শোনাতে চান । আর লুক যেন সেন্ট পলের উকিল এবং অন্যান্ন শিষ্যদের বিরুদ্ধে তার দাবি সমর্থন করতে চান । আর যোহন যেন খৃষ্টিয় প্রথম শতকের শেষের দিকে খৃষ্টানদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া দার্শনিক সূফিবাদী তত্ত কথা দ্বারা প্রভাবিত । এভাবে বাইবেল গুলোর ভেতরে তত্তগত মতভেদ শাব্দিক বিরোধের চেয়েও বেশি হয়ে গেছে ।


ওদিকে ইঙ্জিল গুলো লিপিবদ্ধ করার কোন চেষ্টাই খৃষ্টিই দ্বিতীয় দশকের আগে করা হয়নি । ১৫০ সাল পর্যন্ত এই ধরনের ধারনা প্রচলিত ছিল যে , লেখার চেয়ে মৌখিক বর্ননা অধিক ফলদায়ক । দ্বিতীয় শতাব্দির শেষের দিকে যা লিখা শুরু হল সেগুলোকে নির্ভরযোগ্য বলে মেনে নেওয়া হলোনা । নিউটেষ্টামেন্টের প্রথম প্রামান্য পান্ডুলীপিটি ৩৯৭ সালে অনুষ্ঠিত কর্টোজেনা কাউন্সিলে অনুমোদন দেওয়া হয় ।


৪ খানা বাইবেলই প্রথমে গ্রীক ভাষায় লিখিত হয়েছিল । অথচ হযরত ঈসা (আঃ)-ও তার সমস্ত শিষ্যদের ভাষা ছিল সূরিয়ানী । এভাবে ভাষার পরিবর্তনের কারনে চিন্তাধারা ও বক্তব্যের বিষয়ের পরিবর্তন হওয়া অত্যন্ত স্বভাবিক । ইঞ্জিলের যে প্রাচীন কপিটি বর্তমান পৃথিবীতে প্রচলিত তা খৃষ্টিয় চতুর্থ শতকের । দ্বিতীয় লিপিটি পঞ্চম শতকের।


আর তৃতীয় যে অসম্পূর্ন লিপিটি রোমের পোপের লাইব্রেরীতে আছে,সেটাও চতুর্থ শতাব্দির চেয়ে বেশি প্রাচিন নয় । সূতরাং প্রথম তিন শতাব্দিতে যে বাইবেল প্রচলিত ছিল তার সাথে বর্তমান বাইবেল কতখানি সংগতিপূর্ন তা বলা কতটা কঠিন,চিন্তাশীল ব্যাক্তিমাত্রই তা অনুধাবন করতে সক্ষম হবে ।



সে পরে যখন লিপিবদ্ধ করার কাজ শুরু হয় তখন তা নির্ভরশীল ছিল লিপিকারকদের কৃপার ওপর। লিপিকরনের সময় যে সকল জিনিষ লিপিকারকদের চিন্তা-চেতনা ও আদর্শ বিশ্বাসের পরিপন্থি তা কাট-ছাট করে নিজের চিন্তা-চেতনা ও আদর্শ বিশ্বাস অনুপ্রবিষ্ট করাটা অসম্ভবের কিছুই না । সূতরাং খৃষ্টানদের কাছে তাদের ধর্মের অবস্থা তখন যেমন ছিল বর্তমানে তারচেয়ে উন্নত তো নয়ই বরং অবনতিই আশা করা যায় ।
সময়ে বাইবেলকে কূরআনের মত মুখস্ত করার কোন চেষ্টাই করা হয়নি । প্রথম দিকে এর প্রচার ও প্রসার সম্পূর্ন রূপে মর্মগত বর্ননার ওপর নির্ভরশীল ছিল । বাইবেল এর শব্দ নয় - এর বিষয় বস্তু প্রচার করা হতো । এতে স্মৃতির ত্রুটি-বিচ্যুতি এবং বর্ননাকারকদের নিজস্ব ধ্যান-ধারনা প্রতিফলিত হওয়া স্বাভাবীক ।


                   
ইঞ্জিল বারবানাস

হযরত ঈসা (আঃ)-এর নিজের সঠিক অবস্থা ও তার প্রদত্ব আসল শিক্ষাবলী জানার নির্ভরযোগ্য সূত্র সেই ৪ খানা ইঞ্জিল নয়,যেগুলোকে খৃষ্টান গির্জা নির্ভরযোগ্য ও সর্বসমর্থিত ইঞ্জিল (Canonical Gospels One Copy) রুপে গ্রহন করে নিয়েছে । বরং তার জন্য অধিক অধিক বিশ্বাসযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য উপায় হল সেই 'ইঞ্জিল বারবানাস' ! যাকে গির্জা বেআইনি , সন্দেহজনক ও অপ্রমানিক (Apycryphal) বলে চিহ্নিত করেছে । খৃষ্টানরা এই ইঞ্জিল লুকিয়ে রাখার জন্য অনেক চেষ্টা-যন্ত করেছে । শত শত বছর পর্যন্ত তা দুনিয়ায় অপরিচিত ও অপ্রকাশিত হয়ে রয়েছে । ষষ্ঠদশ শতকে এর ইটালিয় অনুবাদের মাত্র একখানা বই One copy পোপ সিক্সটাস (Sixtus) এর গ্রন্থাগারে পাওয়া যেত , তা অন্য কারও পাঠ করার অনুমতি ছিল না । অষ্টাদশ শতাব্দির শুরুতে সেটা ডন টোলেগু নামক একজন ব্যাক্তির হস্তগত হয় । অতপর বিভিন্ন হাত ঘুরে ১৭৩৮ খৃষ্টব্দে তা ভিয়েনা ইম্পিরাল লাইব্রেরিতে পৌছে । ১৯০৭ খৃষ্টাব্দে এই বইয়ের ইংরেজি অনুবাদ অক্সফোর্ডের ক্লে'রিন্ডন প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়েছিল । কিন্তু তা প্রকাশিত হওয়ার পরই সম্ভবত খৃষ্টান জগত অনুভব করতে পারল যে,যে ধর্মমতকে হযরত ইসা (আঃ)-এর নামে চালানো হচ্ছে , এই বই সেই সেই ধর্মের মূল শিকড় কেটে ফেলে । এ কারনে ঐ মুদ্রিত বই গুলো বিশেষ ব্যাবস্থাপনায় লুকিয়ে ফেলা হয় । এরপর তা আর কখনও প্রকাশিত হতে পারেনি । অপর একখানা বই এই ইটালিও অনুবাদ হতে স্পেনিয় ভাষায় , তা অষ্টদশ শতকে পাওয়া যেত । জর্জ সেল তার কূরআনের ইংরেজি অনুবাদের ভূমিকায় এর কথা উল্লেখ করেছেন । কিন্তু তাও কোথাও লুকিয়ে রাখা হয়েছিল । ফলে বর্তমানে সেটারও কোন নাম-চিহ্ন কোথাও খুজে পাওয়া যায় না । অক্সফোর্ড থেকে প্রকাশিত এর ইংরেজি একটা কপি বহুকষ্টে একজন মুসলীম পন্ডিতের হস্তগত হয় ফলে শতশত বছর ধরে লুকায়িত সত্য প্রকাশিত হয়ে পড়ে । এই কপিটি সত্যিই অনেক বড় নিয়ামত ।খৃষ্টানরা নিছক হিংসা ও বিদ্বেশের কারনে সে ইঞ্জিল থেকে নিজেদের বষ্ণিত করে রেখেছে ।

খৃষ্টানদের বই-পুস্তকে যেখানেই এই ইঞ্জিলের উল্লেখ আসে , তখন তাকে এই বলে প্রত্যাখ্যান করা হয়যে , এটা নাকি জাল ইঞ্জিল ! কিন্ত তাদের এই কথা ডাহা মিথ্যা ছাড়া কিছুইনা । এই গ্রন্থের বিভিন্য স্থানে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর আগমন সম্পর্কে ভবিষ্যৎবানী উল্লেখর উল্লেখ আছে বলেই তারা উক্ত ইঞ্জিল সম্পর্কে এমন অপপ্রচার করেছে এবং করছে ।

নবী করীম (সাঃ)-এর জন্মের ৭৫ বছর পূর্বে পোপ প্রথম গেলাসিয়াস (Gelasius) এর সময়ে খারাপ বিশ্বাস ও বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী (heretical) গন্থাবলির যে তালিকা তৈরি হয়েছিল 'ইঞ্জিল বারবানাস' ও তার অন্তর্ভূক্ত ছিল । ইতিপূর্বে খৃষ্টান গির্জায় দির্ঘদিন পর্যন্ত বারবানাসের ইঞ্জিল প্রচলিত ছিল । একে নিষিদ্ধ করা হয় ষষ্ঠ শতাব্দিতে ।

বাইবেলে যে ৪ খানা ইঞ্জিল গ্রন্থকে আইনসম্মত ও নির্ভরযোগ্য ঘোষনা করে সামিল করা হয়েছে তন্মন্ধে একখানা গ্রন্থের লেখকও ঈসা (আঃ)-এর কোন সাহাবি । লেখকদের একজনও এই দাবি করেননি যে,তিনি হযরত ঈসা (আঃ)-এর সাহাবিদের কাছ থেকে তত্ত্ব ও তথ্য নিজের ইঞ্জিলে সামিল করেছেন । তারা যেসব উপায় ও সূত্র হতে তত্ত্ব ও তথ্য সংগ্রহ করেছেন তার পরিচয়ও তারা দেননি । এর মূল বর্ননাকারী নিজ চোখে যেসব ঘটনা দেখেছেন এবং যেসব কথা নিজের কানে শুনেছেন বলে তিনি বর্ননা করেছে , কিংবা এক বা একাধিক সূত্রের মাধ্যমে সেই কথাগুলো তার কাছে পৌছেছে,এ বিষয়ে কিছুই জানা যায় না । এটি একটি মৌলিক ত্রুটি । কিন্তু 'ইঞ্জিল বার্বানাস' এই সব দোষ ও ত্রুটি থেকে সম্পূর্ন মুক্ত । এই ইঞ্জিল রচয়িতা নিজেই বলেছেন,আমি নিজে হযরত ঈসা মসীহের প্রাথমিক বারোজন হাওয়ারীর একজন । শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমি নিজে হযরত ঈসা মসীহের সঙ্গে রয়েছি । আমার নিজের চোখে দেখা ঘটনাবলী ও নিজের কানে শোনা কথা এবং বানীসমূহ আমি এই গ্রন্থে সন্নিবেশিত করেছি । এতটুকু লিখেই তিনি ক্ষান্ত হননি । গ্রন্থের শেষভাগে তিনি বলেছেন,আমার সম্পর্কে যেসব ভুল ধারনা লোকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে তা দূর করে দিও এবং যথাযথ অবস্থায় দুনিয়ার সম্মুখে উদঘাটিত করে দেওয়া তোমারই দায়িত্য ।














বারবানাস কে ছিলেন 

এই বারবানাস কে ছিলেন ? বাইবেলের কার্যাবলী (প্রেরিতদের কার্য) এ নামের এক ব্যাক্তির বার বার উল্লেখ এসেছে । এই ব্যাক্তি ছিল ইহুদি পরিবারের লোক খৃষ্টান ধর্ম প্রচার ও ঈসা মসীহর অনুসারিদের সাহায্য সহযোগিতা করার ব্যাপারে তার অবদানের খুব বেশি প্রশংসা করা হয়েছে । কিন্তু সে কবে খৃষ্টান ধর্ম গ্রহন করেছিল তা কোথাও বলা হয়নি । প্রাথমিক ১২ জনের যে তালিকা তিনখানা ইঞ্জিলে দেওয়া হয়েছে তাতে তার নাম উল্লেখ করা হয়নি । কাজেই এই ইঞ্জিলের লেখক সেই বারবানাস কিংবা অন্য কেউ তা নিশ্চিত করে বলা যায় না । মথি ও মার্ক শিষ্যদের (Apostles) যে তালিকা দিয়েছেন,বারবানাসের দেয়া তালিকার সাথে মাত্র দুইটা নামের পার্থক্য । একজনের নাম হলো তুমা । এর পরিবর্তে বারবানাস নিজের নাম উল্লেখ করেছেন । লুক ইঞ্জিলে এই ২য় নামটিও রয়েছে । একারনে এরুপ ধারনা করার যোক্তিকতা আছে যে,পরবর্তিকালে কোন এক সময় হাওয়ারি শিষ্যদের তালিকা থেকে বারবানাসকে বহিষ্কৃত করার উদ্দেশ্যে তুমা'র নাম শামীল করাহয়েছে,যেন বারবানাসের ইঞ্জিল থেকে নিষ্কৃতি লাভ করা যায় । আর নিজেদের ধর্মগ্রন্থ সমূহে এই ধরনের পরিবর্তন করে নেওয়া এদের কাছে কোন দিনই কোন দোষ বা পাপের কাজ ছিল না,তা সর্বজনবিদিত ।

৪টি ইঞ্জিলের অসংলগ্ন কাহিনীর তুলনায় এই গ্রন্থের ঐতিহাসীক বর্ননাবলীয় অধিক সুসংবদ্ধ । এর বর্ননায় মাধ্যমে ঘটনাবলীর ধারাবাহীকতা অতীব উত্তমভাবে বুঝতে পারা যায় । হযরত ঈসা (আঃ)-এর প্রদত্ব শিক্ষাবলী চার ইঞ্জিলের তুলনায় এই গ্রন্থটিতেই অধিক স্পষ্ট,বিস্তারিত ও মর্মস্পর্ষিভাবে বিবৃত হয়েছে । চারটি ইঞ্জিলের উদৃত তার বহু বানী ও কথার মধ্যে যে বিরোধ ও অসংগতি সুস্পষ্ট,এই গ্রন্থটিতে তার নাম গন্ধও পাওয়া যাবে না ।

এই ইঞ্জিলে হযরত ঈসা (আঃ)-এর জীবন ও তার শিক্ষাবলী একজন নবীর জীবন ও শিক্ষাবলীর মতই পুরাপুরিভাবে মনে হবে । তিনি এতে একজন নবী হিসাবেই নিজেকে উপস্থাপিত করেছেন ।

বারবানাসের ইঞ্জিলের নানা স্থানে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর আগমন সম্পর্কে স্পষ্ট ভবিষ্যৎবানী উদৃত হয়েছে । আর এই করনেই খৃষ্টানরা এই ইঞ্জিল প্রত্যাখ্যান করেছে সত্যকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য ।












শেষ কথা

হযরত ঈসা (আঃ-এর প্রথম যুগের অনুসারিরা তাকে একজন নবী মাত্র জানতেন । মূসা (আঃ)-এর প্রবর্তিত শরিয়াত মেনে চলতেন । আকিদা-বিশ্বাস,হুকুম-আহকাম ও ইবাদত-বন্দেগির ব্যাপারে নিজেদেরকে অন্যান্ন বনী ইসরাইল হতে কিছু মাত্র ভিন্ন,স্বতন্ত্র,বিচ্ছিন্ন মনে করতেন না । ইহুদিদের সাথে তাদের মতবিরোধ ছিল শুধু এ ব্যাপারে যে,এরা হযরত ঈসা (আঃ) কে মসীহ মানতে অস্বীকার করেছিল । উত্তর কালে যখন সেন্ট পল এই দলে শামিল হলেন,তখন তিনি রোমান,গ্রিক ও অন্যান্ন অ-ইয়াহুদি লোকদেরকে ও অ-ইসরাঈলী লোকদের মধ্যেও এই দীনের প্রচার ও প্রসার শুরু করলেন । এই উদ্দেশ্যে তিনি একটি নতুন দীন রচনা করলেন ।

এই দীনের আকিদা-বিশ্বাস,মুলনীতি ও আদেশ-নিষেধ হযরত ঈসা (আঃ)-এর পেশ করা দীন থেকে সম্পূর্ন ভিন্নতর ও অন্য রকম ছিল । এই ব্যাক্তি হযরত ঈসা (আঃ)-এর কোন সাহচর্য পাননি । বরং তিনি ঈসা (আঃ)- জীবদ্দসায় তার চরম বিরোধি ছিলেন । তারপর কয়েক বছর পর্যন্ত তার অনুসারীদের শত্রু হয়ে ছিলেন । পরে এই দলে শামিল হয়ে তিনি যখন একটা নতুন ধর্মমত রচনা করতে শুরু করলেন,তখন তিনি হযরত ঈসা (আঃ)-এর কোন কথার সনদ পেশ করেননি । তিনি ভিত্তি করেছেন নিজের কাশফ ও ইহলাম এরই উপর । এই নূতন ধর্ম রূপায়নে তার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল,ধর্ম এমন হতে হবে যা সাধারন অ-ইয়াহুদি (Gentile) জগৎ গ্রহন করবে । তিনি ঘোষনা করেছিলেন,খৃষ্টানরা ইয়াহুদি শরীয়তের বাধ্যবাধকতা থেকে সম্পূর্ন মুক্ত । পানাহারের ক্ষেত্রে হালাল-হারামের সকল বিধান তিনি খতম করে দিয়েছিলেন । খাতনা করার বিধানও তিনি নাকচ করে দেন । আর এ সকল বিধান অ-ইয়াহুদিদের কাছে অসহ্যের ব্যাপার ছিল । এমনকি তিনি মসীহর ইলাহ হওয়া,খোদার পুত্র হওয়া এবং শূল বিদ্ধ হয়ে প্রানদান করতঃ আদম সন্তানের জন্মগত পাপের প্রায়শ্চিত্ত হয়ে যাওয়ার আকিদাও রচনা করেন । প্রাথমীক পর্যায়ের অনুসারীগন এসব বিদআতের বিরোধিতা করেন । কিন্তু যে দ্বার উন্মুক্ত করে দিলেন,তা থেকে অ-ইয়াহুদি খৃষ্টানদের একটা বিরাট বন্যা প্রবাহ এই ধর্মে অনুপ্রবেশ করার সুযোগ লাভ করল । ফলে সেন্টপল বিরোধি মুষ্টমেয় লোক এর মুকাবেলায় মুহূর্তের তরেও টিকতে পারলো না । এ স্বত্তেও খৃষ্টিয় তৃতীয় শতাব্দির সমাপ্তিকাল পর্যন্ত হযরত ঈসার ইলাহ হওয়ার ধারনাকে অস্বীকার করে এমন বহু লোকই বর্তমান ছিল ।

চতুর্থ শতাব্দির শুরুতে (৩২৪ খৃ.) নাকিয়ার (Nicaea) কাউন্সিল সেন্টপল প্রবর্তিত আকীদাকে সর্বসম্মত খৃষ্টান ধর্মমত রূপে মনোনিত করে নিল । পরে রোমান সম্রাট ও সাম্রাজ্য নিজ থেকেই খৃষ্টান হয়ে গেল । এরপর এই ধর্মমতের বিপরীত আকীদা পেশ করার সমস্ত গ্রন্থাদি পরিত্যাক্ত ও বে-আইনি ঘোষিত হলো এবং এই আকিদার অনুকূল সমস্ত গ্রন্থাদি নির্ভরযোগ্যরূপে গৃহীত হলো । ৩৬৭ খৃষ্টাব্দে প্রথমবার আথানাসিয়াস (Athanasius) লিখিত একটি চিঠির নির্ভরযোগ্য ও সর্বসম্মত গ্রন্থাবলীর একটি সমষ্টি ঘোষনা করা হল । পরে ৩৮২ খৃষ্টাব্দে পোপ ডেমানিয়াস (Damasius)-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে তার সত্যতা স্বীকার (Ratification) করে নিল । পঞ্চম শতকের শেষে পোপ গেলাসিয়াস (Gelasius) এ গ্রন্থ সমষ্টিকে সর্বসম্মত ঘোষনা করার সঙ্গে সঙ্গে অসমর্থিত গ্রন্থাবলীরও একটি তালিকা রচনা করে দিল ।অথচ পল প্রবর্তিত যে সব আকিদা-বিশ্বাসকে ভিত্তি রুপেগ্রহন করে ধর্মিয় গ্রন্থাবলীর নির্ভরযোগ্য ও অনির্ভরযোগ্য হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল,সে সম্পর্কে কোন খৃষ্টান পন্ডিত কখনও এই দাবি করতে পারেনি যে,তার মধ্যে কোন একটি আকিদা-বিশ্বাসঈসা (আঃ) নিজে শিক্ষা দিয়েছিলেন । বরং গ্রহনীয় কিতাব গুলোর মধ্যে যে সকল ইঞ্জিল গন্য তাতে হযরত ঈসা (আঃ)-এর নিজের উক্তি বলে এই সব আকিদার কোন প্রমান পাওয়া যায় না ।বারবানাস এর ইঞ্জিল খৃষ্টধর্মের সরকারী আকীদার সম্পূর্ন বিপরীত আকিদা পেশ করে বিধায়,একে অগ্রহনীয় ও অসমর্থিত গ্রন্থাদির মধ্যে গন্য করা হয়েছে । এই গ্রন্থকার গ্রন্থের ভূমিকায় এই গ্রন্থ রচনার উদ্দেশ্য বর্ননা করে বলেছেন, 'সেই লোকদের মতাবলীর সংশোধন করিতে হইবে,যাহারা সয়তানের প্রতারনায় প্রতারিত হইয়া ঈসা মসীহ'কে খোদার পূত্র বলিয়া মনে করিতে শুরু করিয়াছে,খাতনা করা অপ্রয়োজনীয় মনে করে । সেন্টপল এই প্রতারিত দলের একজন ।'

গ্রন্থকার বলেন,হযরত ঈসা যখন দুনিয়ায় ছিলেন , তখন তাহার মুযিযা সমূহ দেখিয়া সর্বপ্রথম মুশরিক রোমান সৈন্যরা তাকে খোদা এবং কিছু লোক তাকে খোদার পূত্র বলিতে শুরু করিল । পরেন বনী ইসরাইলের সাধারন মানুষের মনেও এই ছোয়াচ লাগিয়া যায় । ইহাতে হযরত ঈসা খুবই বিব্রত হইয়া পড়েন । তিনি বার বার অত্যন্ত কঠোরতা সহকারে তাহার নিজের সম্পর্কিত এই ভুল আকিদার তিব্র প্রতিবাদ করিলেন এবং যাহারা তাহার সম্পর্কে কথা-বাত্রা বলে তাহাদের উপর অভিশাপ বর্ষন করিলেন এবং এর তিব্র প্রতিবাদ করিলেন । পরে তিনি তাহার শিষ্যবর্গকে সমগ্র ইয়াহুদায় এই আকিদার প্রতিবাদ করার জন্য পাঠিয়ে দিলেন । অতঃপর তাহার দোয়ায় শিষ্যদের দ্বারাও সেই সব মুযিযা সংঘঠিত করাইলেন যাহা স্বয়ং হযরত ঈসা (আঃ) কতৃক সংঘঠিত হইতেছিল । যেন যে লোকের দ্বারা এই মুযিযা সংঘঠিত হয় সে খোদা বা খোদার পূত্র এই ভূল ধারনা সহজেই দূর হয়ে যায় ।

এই পসঙ্গে হযরত ঈসা (আঃ)- বিস্তারিত ভাষন উদৃত করেছেন । তাতে তিনি কঠোর ভাষায় এই সব ভুল বিশ্বাসের প্রতিবাদ করেছেন । এই বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ার দরুন তিনি নিজে যে বিব্রত ও কাতর হয়ে পড়েছিলেন,নানা স্থানেতার বর্ননাও দিয়েছেন । এতদ্যত্যিত হযরত ইসা মসীহ সূলে প্রান ত্যাগ করেছেন - সেন্টপল রচিত এই ভ্রান্ত আকিদারও তিব্র প্রতিবাদ করা হয়েছে এই গ্রন্থে । গ্রনহথকার তার প্রত্যক্ষ বিবরনে বলেছেন,ইয়াহুদ ইস্কারিউতি যখন ইয়াহুদিদের সরদার পার্দ্রির নিকট হইতে ঘুষ গ্রহন করিয়া হযরত ঈসাকে গ্রেফতার করাইবার জন্য সিপাহীদের লইয়া আসিল,তখন আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে চারজন ফেরেশতা তাহাকে তুলিয়া লইয়া গেলেন এবং ইস্কারিউতির আকৃতি ও কন্ঠস্বর হযরত ঈসার মতই বানাইয়া দেওয়া হইয়াছিল । এবং তাহাকেই শুলে চড়ানো হইয়াছিল-হযরত ঈসাকে নয় ।এভাবেই এই ইঞ্জিল গ্রন্থটি-সেন্টপল রচিত খৃষ্টধর্মের শিকড় উৎপাটন করে দিয়েছে । সেই সঙ্গে কূরআন শরিফের এতদসম্পর্কিয় বর্ননার সত্যতা ও যথার্তা ঘোষনা করেছে । অথচ কূরআন নাযিল হওয়ার ১১৫ বছর পূর্বে এই গ্রন্থটির এম্বিধ বর্ননা সমূহের কারনেই খৃষ্টান পার্দ্রিগন তাকে সম্পূর্নভাবে প্রত্যাক্ষান করেছিল ।

ইঞ্জিল বারবানাস এর সাহায্যে নিজেদের আকিদা-বিশ্বাসকে সংসোধিত ও নির্ভুল ভাবে গড়ে তোলা ও হযরত ঈসা মসীহ'র আসল শিক্ষাদি জেনে নেওয়ার যে মহা সুযোগ খৃষ্টানদের কাছে ছিল,কেবলমাত্র জিদের বশবর্তি হয়েই তারা তা হতে নিজেদের বষ্ণিত করে রাখলো ।





 (সমাপ্ত) —          সংকলনে – মোঃ রেজওয়ানূর রহমান            

                                মূল লেখক – মোদাস্সেম আল হোদাইবি



https://www.dropbox.com/.../Gospel%20of%20Barnabas.pdf...


Gospel of Barnabas.pdf
Shared with Dropbox
dropbox.com


or
https://app.box.com/s/ks9qcomic87y7tushc1c

ব্যভিচারের শাস্তি কি? রজম কি কুরআন বিরোধী শাস্তি?

লিখেছেনঃ রিজভি আহমেদ খান




ব্যভিচার (Fornication) হল দুজন অবিবাহিত(নারী-পুরুষ) বা অবিবাহযোগ্য (রক্তসম্পর্ক বা সমলিঙ্গ , রক্তসম্পর্কীয় যৌনতা অজাচারের অন্তর্ভূক্ত) ব্যক্তির মধ্যে ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত সংঘটিত যৌনকর্ম।
Fornication is generally consensual sexual intercourse between two people not married to each other.(Wikipedia)
ইসলামে ব্যভিচার একটি জঘন্য অপরাধ। হত্যার পরই এটি সবচেয়ে জঘন্য অপরাধ। আল্লহ ইহকালে এবং পরকালে উভয় সময়ই এর শাস্তির কথা বলেছেন।তবে তাওবাকারীর কথা ভিন্ন।
সূরা ফুরকান (৬৭-৭০) " এবং যারা আল্লাহর সাথে অন্য উপাস্যের এবাদত করে না, আল্লাহ যা হত্যা অবৈধ করেছেন, সঙ্গত কারণ ব্যতীত
তাকে হত্যা করে না এবং ব্যভিচার করে না। যারা একাজ করে, তারা শাস্তির সম্মুখীন হবে।
ﻳُﻀَﺎﻋَﻒْ ﻟَﻪُ ﺍﻟْﻌَﺬَﺍﺏُ ﻳَﻮْﻡَ ﺍﻟْﻘِﻴَﺎﻣَﺔِ ﻭَﻳَﺨْﻠُﺪْ ﻓِﻴﻪِ ﻣُﻬَﺎﻧًﺎ
কেয়ামতের দিন তাদের শাস্তি দ্বিগুন হবে এবং তথায় লাঞ্ছিত অবস্থায় চিরকাল বসবাস করবে।
ﺇِﻟَّﺎ ﻣَﻦ ﺗَﺎﺏَ ﻭَﺁﻣَﻦَ ﻭَﻋَﻤِﻞَ ﻋَﻤَﻠًﺎ ﺻَﺎﻟِﺤًﺎ ﻓَﺄُﻭْﻟَﺌِﻚَ ﻳُﺒَﺪِّﻝُ ﺍﻟﻠَّﻪُ
ﺳَﻴِّﺌَﺎﺗِﻬِﻢْ ﺣَﺴَﻨَﺎﺕٍ ﻭَﻛَﺎﻥَ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻏَﻔُﻮﺭًﺍ ﺭَّﺣِﻴﻤًﺎ
কিন্তু যারা তওবা করে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম করে, আল্লহ তাদের গোনাহকে পুন্য দ্বারা পরিবর্তত করে এবং দেবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
ﻭَﻣَﻦ ﺗَﺎﺏَ ﻭَﻋَﻤِﻞَ ﺻَﺎﻟِﺤًﺎ ﻓَﺈِﻧَّﻪُ ﻳَﺘُﻮﺏُ ﺇِﻟَﻰ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﻣَﺘَﺎﺑًﺎ
আল্লহ ইহকালের শাস্তির কথা বলছেন এবং আবার বলছেন পরকালে দ্বিগুণ শাস্তির কথা বলছেন।আবার যে তাওবা করছে তাকে ক্ষমা করার কথাও বলছেন।নিশ্চয় তিিন অত্যন্ত দয়ালু এবং ক্ষমাশীল।
ব্যভিচারের শাস্তি কখন হয় এ বিষয় নিয়ে আগে বলিঃ
ﻭَﻻَ ﺗَﻘْﺮَﺑُﻮﺍْ ﺍﻟﺰِّﻧَﻰ ﺇِﻧَّﻪُ ﻛَﺎﻥَ
ﻓَﺎﺣِﺸَﺔً ﻭَﺳَﺎﺀ ﺳَﺒِﻴﻼً
আর ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয় এটা অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ।(সূরা নূর ২)
★ ব্যভিচার করলে যদি তা গোপন থাকে তাহলে এক্ষেত্রে তার জন্য তওবা করায় যথেস্ট।
(১)
ﺇِﻟَّﺎ ﻣَﻦ ﺗَﺎﺏَ ﻭَﺁﻣَﻦَ ﻭَﻋَﻤِﻞَ ﻋَﻤَﻠًﺎ ﺻَﺎﻟِﺤًﺎ ﻓَﺄُﻭْﻟَﺌِﻚَ ﻳُﺒَﺪِّﻝُ ﺍﻟﻠَّﻪُ
ﺳَﻴِّﺌَﺎﺗِﻬِﻢْ ﺣَﺴَﻨَﺎﺕٍ ﻭَﻛَﺎﻥَ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻏَﻔُﻮﺭًﺍ ﺭَّﺣِﻴﻤًﺎ
কিন্তু যারা তওবা করে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম করে, আল্লহ তাদের গোনাহকে পুন্য দ্বারা পরিবর্তত করে এবং দেবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।(সূরা ফুরকান ৬৯)

ﺇِﻟَّﺎ ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﺗَﺎﺑُﻮﺍ ﻣِﻦ ﺑَﻌْﺪِ ﺫَﻟِﻚَ
ﻭَﺃَﺻْﻠَﺤُﻮﺍ ﻓَﺈِﻥَّ ﺍﻟﻠَّﻪَ ﻏَﻔُﻮﺭٌ
ﺭَّﺣِﻴﻢٌ
কিন্তু যারা এরপর তওবা করে এবং সংশোধিত হয়, আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম মেহেরবান।(সূরা নূর ৫)
""কেউ যদি ব্যভিচার করে এবং আল্লহ তালার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে মহান আল্লহ তার গোনাহ মাফ করে দিবেন।আল্লহ শিরক যদি ক্ষমা করেন,তাহলে ব্যভিচার কেন ক্ষমা করবেন না?""
মূল বক্তব্যে হলো অপ্রকাশিত এবং অপ্রমাণিত ব্যভিচারের জন্য কোনো শাস্তি নেই। যদি ব্যভিচার গোপন থাকে এবং ব্যভিচারী তাওবা করে তাহলে হয়তো সে ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভুক্ত হবে না।কিন্তু যদি প্রমাণিত হয় তবে তাকে শাস্তি পেতে হবে।সমাজে একটা প্রচলিত প্রবাদ আছে-" চুরি বিদ্যা মহাবিদ্যা যদি না পড়ো ধরা"।এখানেও বিষয়টা অনেকটা ঐরকমই।অপ্রকাশিত এবং অপ্রমাণিত ব্যভিচারের কোনো শাস্তি নেই।
নিচের হাদিসটি দেখুনঃ
হযরত আব্দুল্লাহ বিন উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) বলেন- তোমরা ব্যভিচার থেকে দূরে থাকো যা আল্লহ তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।এরপরও যে শয়তানের পড়ে তা করে ফেলে সে যেন তা লুকিয়ে রাখে। যখন আল্লহ তা গোপনই রেখেছেন।তবে সে যেন এ জন্য আল্লহ তালার নিকট তাওবা করে নেয়। কারণ যে ব্যক্তি তা আমাদের নিকট প্রকাশ করে তার উপর আমরা অবশ্যই আল্লহ তালার বিধান প্রয়োগ করবো। (হাকিম ৪/২৭২)
দেখেছেন নবী সাঃ কি বললেন? যদি কেউ ব্যভিচার করে যে যেন তা গোপন রাখে।আর আল্লহর কাছে যেন তাওবা করে; এটাই যথেষ্ট।কিন্তু যদি তা প্রকাশিত হয় তবে তার উপর আল্লহর বিধান প্রয়োগ করা হবে। সুতরাং শাস্তি কেবল প্রকাশিত ব্যভিচারের জন্য।আর নবী সাঃ ব্যভিচারকে গোপন রাখাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন এবং শাস্তি দেওয়াটাই অপছন্দ করেছেন।
যেমন হযরত মায়িয বিন মালিক রাঃ যখন রাসূল সাঃ এর নিকট বার বার ব্যভিচারের স্বীকারোক্তি করছিলেন তখন রাসূল তার প্রতি এতটুকুও ভ্রুক্ষেপ করেন নি।চার বারের পর তিনি তাকে এও বলেনঃ হয়তো বা তুমি তাকে চুমু দিয়েছো, ধরেছো কিংবা তার প্রতি দৃষ্টিপাত করেছো।কারণ এতে করে তিনি তাকে ব্যক্তিগতভাবে আল্লহ তা'আলার নিকট খাঁটি তওবা করার সুযোগ করে দিতে চেয়েছিলেন।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ব্যভিচারের জন্য তওবা করায় যথেষ্ট। তবে যদি ব্যভিচার করার কথা প্রকাশিত হয়ে পড়ে তাহলে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে।এর অনেকগুলো কারণ রয়েছেঃ
আমরা জানি,নামায পড়া অতি গুরুত্বপূর্ণ ফরয।তবে কেউ যদি নামায না পড়ে তাহলে এতে সে ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে,কিন্তু এতে অন্যের কিংবা সমাজের কোনো ক্ষতি হয় না।কিন্তু ব্যভিচার এমন একটি পাপ যা একা হয় না; অন্যে আর একজন পুরুষ কিংবা নারীর প্রয়োজন হয়।সামাজিক সম্পর্ক নষ্ট হয়। ডিভোর্স বৃদ্ধি পায়, সমাজে মর্যাদার হ্রাস ঘটে।বিভিন্ন যৌন রোগ সৃষ্টি হয়।যেমন- সিফিলিস, গনোরিয়া,এইডস ইত্যাদি।এবং ব্যভিচারের প্রসারের ফলে এগুলো মহামারী আকার ধারণ করে।তাই ব্যভিচার বন্ধের জন্য দৃষান্তমূলক শাস্তির প্রয়োজন।কারণ যদি কোনো শাস্তির ব্যবস্থা না করা হয় তাহলে এটা ব্যপকভাবে প্রসার পেত।তাই ব্যভিচারীর শাস্তির প্রয়োজন।
আমরা জানলাম ব্যভিচারের শাস্তি কখন হয় এবং কেন শাস্তি হওয়া উচিত।এবার ব্যখিচারের শাস্তি কি তা জানতে হবে।
১)বিবাহিতদের ব্যভিচারের শাস্তি প্রস্তরাঘাতে মৃত্যু।
২)অবিবাহিতদের ব্যভিচারের শাস্তি একশ বেত্রাঘাত।
তার আগে ব্যভিচারের শাস্তির পূর্বশর্ত আগে জেনে নিঃ
আপনি যদি আমাকে জিজ্ঞেস করেন ইসলামী শরিয়া অনুযায়ী কোন শাস্তি প্রয়োগ করা সবচেয়ে কঠিন? আমি কোনো সন্দেহ ছাড়াই বলব ব্যভিচারীর শাস্তি।
ব্যভিচার প্রমাণ করতে চার জন সাক্ষী আনতে হবে।
ﻭَﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﻳَﺮْﻣُﻮﻥَ ﺍﻟْﻤُﺤْﺼَﻨَﺎﺕِ
ﺛُﻢَّ ﻟَﻢْ ﻳَﺄْﺗُﻮﺍ ﺑِﺄَﺭْﺑَﻌَﺔِ ﺷُﻬَﺪَﺍﺀ
ﻓَﺎﺟْﻠِﺪُﻭﻫُﻢْ ﺛَﻤَﺎﻧِﻴﻦَ ﺟَﻠْﺪَﺓً ﻭَﻟَﺎ
ﺗَﻘْﺒَﻠُﻮﺍ ﻟَﻬُﻢْ ﺷَﻬَﺎﺩَﺓً ﺃَﺑَﺪًﺍ
ﻭَﺃُﻭْﻟَﺌِﻚَ ﻫُﻢُ ﺍﻟْﻔَﺎﺳِﻘُﻮﻥَ
যারা সতী-সাধ্বী নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে অতঃপর স্বপক্ষে চার জন পুরুষ সাক্ষী উপস্থিত করে না,তাদেরকে আশিটি বেত্রাঘাত
করবে এবং কখনও তাদের সাক্ষ্য কবুল করবে না। এরাই না’ফারমান।(সূরা নূর ৪)
ব্যভিচার প্রমাণ করতে হলে চার জন সাক্ষী লাগবে।যদি না আনতে পারে তাহলে তাকে ৮০ টা বেত্রাঘাত করতে হবে।
নিচের হাদিসটা দেখুনঃ
"(৪৩৮৮-বুখারী) মুহাম্মাদ ইবনু বাশশার (রহঃ) ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত।হিলাল ইবনু
উমাইয়া রাসুলুল্লাহ এর কাছে শারিক ইবনু সাহমার সাথে তার স্ত্রীর ব্যভিচারের অভিযোগ করল।নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বললেন, সাক্ষী (হাযির কর) নতুবা শাস্তি তোমার
পিঠে পরবে। হিলাল বলল,ইয়া রাসুলুল্লাহ! যখন
আমাদের মধ্যে কেউ তার স্ত্রীর উপর অন্য
কাউকে দেখে তখন সে কি সাক্ষী তালাশ করতে যাবে? তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতে লাগলেন,সাক্ষী নতুবা শাস্তি
তোমার পিঠে। হিলাল বললেন, শপথ সে সত্তার,
যিনি আপনাকে সত্য নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিসেবে পাঠিয়েছেন,নিশ্চয়ই আমি সত্যবাদী। অবশ্যই আল্লাহ তা’আলা এমন বিধান
অবতীর্ণ করবেন, যা আমার পিঠকে শাস্তি থেকে মুক্ত করে দিবেন। তারপর জিবরাঈল আলাইহি ওয়া সাল্লাম এলেন এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর নাযিল করা হল-
“যারা নিজেদের স্ত্রীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে”থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাঠ করলেন,“যদি সে সত্যবাদী হয়ে থাকে” পর্যন্ত। তারপর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফিরলেন এবং তার স্ত্রীকে [১] ডেকে আনার জন্য লোক পাঠালেন।।হিলাল
এসে সাক্ষী দিলেন [২] আর রাসুলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলছিলেন, আল্লাহ।তা’আলা তো জানেন যে তোমাদের দুজনের মধ্যে অবশ্যই একজন মিথ্যাবাদী।
তবে কি তোমাদের মধ্যে কেউ তওবা করবে?
স্ত্রীলোকটি দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য দিল। সে যখন পঞ্চম বারের কাছে পৌঁছল, তখন লোকেরা তাকে বাঁধা দিল এবং বলল , নিশ্চয়ই এটি তোমার উপর
অবশ্যম্ভাবী। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বললেন,
একথা শুনে সে দ্বিধাগ্রস্ত হল এবং ইতস্তত করতে লাগল।এমন কি আমরা মনে করতে লাগলাম যে, সে নিশ্চয়ই প্রত্যাবর্তন করবে।
পরে সে বলে উঠল,আমি চিরকালের জন্য আমার বংশকে কলুষিত করবনা।সে তার সাক্ষ্য পূর্ণ করল।[৩] নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এর প্রতি দৃষ্টি রেখ।যদি সে কালো, ডাগর চক্ষু,বড় পাছা ও মোটা নলা বিশিষ্ট
সন্তান প্রসব করে তবে ও সন্তান শারিক ইবনু
সাহমার। পরে সে অনুরূপ সন্তান জন্ম দিল। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বললেন, যদি এ।বিষয়ে আল্লাহর কিতাব
কার্যকর না হত,তাহলে অবশ্যই আমার ও তার
মধ্যে কি ব্যপার যে ঘটত। ১/খাওলা। ২/ আনিত
অভিযোগেরসত্যতা সম্পর্কে শপথ
করলেন। ৩/ পঞ্চম বার শপথ করল।
মহানবী সাঃ সাক্ষী ছাড়া কোনরকম সিদ্ধান্ত দিলেন না।আর সাহাবীর প্রশ্নও অনেক যুক্তিযুক্ত যে, আমাদের মধ্যে কেউ তার স্ত্রীর উপর অন্য
কাউকে দেখে তখন সে কি সাক্ষী তালাশ করতে যাবে? তবুও কিন্তু বললেন, সাক্ষী নতুবা শাস্তি
তোমার পিঠে।
এবার যুক্তিতে আসি...
মানুষ যখন ব্যভিচার করে সাধারণতই তা গোপনে করে।এখন এ অবস্থায় দুইজন ব্যভিচার করছে এবং তাদের চারজন ব্যভিচার করতে দেখবে এটা প্রায় অসম্ভব। তাদের দুই একজন দেখতে পারে এটা স্বাভাবিক কিন্তু পরপর চারজন দেখবে এটা প্রায় অসম্ভব। আর যদি প্রমাণ করতে না পারে তাহলে তো ৮০ বেত্রাঘাতেরও ব্যাপার আছে।হযরত উমর (রাঃ)ও ব্যভিচার করতে দেখেছিলেন এবং তিনি তখন খলিফা ছিলেন; ইচ্ছা করলে শাস্তি দিতে পারতেন কিন্তু সাক্ষীর অভাবে তা সম্ভব হয় নি। তাই বলেছিলাম ব্যভিচারের শাস্তি দেওয়া অসম্ভব একটা ব্যাপার।
তাহলে মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, নবী (সাঃ) তাহলে কিভাবে ব্যভিচারের শাস্তি দিয়েছেন? আচ্ছা, আপনি ব্যভিচারের শাস্তি দেওয়া নিয়ে যতগুলো হাদিস আছে লক্ষ্য করে দেখবেন প্রত্যেকে যারা ব্যভিচার করেছে সকলে নিজে এসে স্বীকারোক্তি দিয়েছে যে, তারা ব্যভিচার করেছে।তারপরও নবী (সাঃ) তা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।কিন্তু তাদের বারবার স্বীকারোক্তির কারণে শাস্তি দিয়েছেন। মায়িয বিন মালিক রাঃ এর ব্যভিচারের শাস্তি দেওয়া তার স্পষ্ট প্রমাণ।মুসলিম স্কলাররা বলেন, ইসলামের যুগে কোনো ব্যভিচারের শাস্তি সাক্ষীর ভিত্তিতে হয় নি,সব হয়েছে মৌখিক স্বীকারোক্তিতে।
সাহাবীদের যুগে এবং তার পরবর্তী যুগের মানুষেরা অধিক তাকওয়াবান ছিলেন।যেহেতু পৃথিবীর শাস্তি তার পাপের কাফফারা হয়ে যায় তাই তারা পাপের কথা স্বীকার করে নিজেদের পবিত্র করেছে।কিন্তু বর্তমানে এমনকি কোনো মানুষ পাওয়া যাবে যে অবশ্যম্ভাবী এমন শাস্তির কথা জেনেও তার পাপের স্বীকারোক্তি দিবে?
তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, ব্যভিচারের শাস্তি দেওয়া খুবই কঠিন কাজ।
এবার আমরা ব্যভিচারের শাস্তি কি তা জানবঃ
১) অবিবাহিত নারী পুরুষ ব্যভিচার করলে তার শাস্তি একশ বেত্রাঘাত (সূরা নূর২) এবং হাদিস অনুসারে একশ বেত্রাঘাত এবং এক বছরের নির্বাসন।(বুখারী, মুসলিম)
এ বিষয় নিয়ে কারো মতভেদ নেই বলে আমার মনে হয়। তবে বিবাহিতদের ব্যভিচারের শাস্তি নিয়ে কিছুটা মতভেদ আছে।তারা কুরআন এবং হাদিস থেকে কিছু ব্যাখ্যা দেয়,তাদের দাবি যৌক্তিক।তবে আশা করি নিচের আলোচনায় এ সম্পর্কে আপনার অনেকটা পরিষ্কার ধারণা দিতে পারব।
হাদিস অনুসারে বিবাহিতদের ব্যভিচারের শাস্তি রজম অর্থ্যাৎ প্রস্তরাঘাতে মৃত্যু।সহীহ বুখারী,মুসলিম এবং অন্যান্য হাদিস গ্রন্থে এ হাদিসগুলো পাবেন।তাই এটা কোনো দ্বিধা ছাড়ায় মেনে নিচ্ছি।রজমের বিধান কার্যকর নেই যারা দাবি করেছে তাদের যুক্তি খন্ডন করার চেষ্টা করব।আমি কারো সমালোচনা করছি না।সবাইকে সম্মান করি।কেবল আমার মতামত দিব।পর্যায়ক্রমে যুক্তিখন্ডন করার চেষ্টা করব।ইনশাআল্লহ।

(১ নং প্রশ্নঃ) কুরআনে নূরের ২ নং আয়াতে বেত্রাঘাতের কথা আছে।আর সেখানে অবিবাহিত ব্যভিচারী বলাও নেই?

ﺍﻟﺰَّﺍﻧِﻴَﺔُ ﻭَﺍﻟﺰَّﺍﻧِﻲ ﻓَﺎﺟْﻠِﺪُﻭﺍ
ﻛُﻞَّ ﻭَﺍﺣِﺪٍ ﻣِّﻨْﻬُﻤَﺎ ﻣِﺌَﺔَ ﺟَﻠْﺪَﺓٍ
ﻭَﻟَﺎ ﺗَﺄْﺧُﺬْﻛُﻢ ﺑِﻬِﻤَﺎ ﺭَﺃْﻓَﺔٌ ﻓِﻲ
ﺩِﻳﻦِ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﺇِﻥ ﻛُﻨﺘُﻢْ ﺗُﺆْﻣِﻨُﻮﻥَ
ﺑِﺎﻟﻠَّﻪِ ﻭَﺍﻟْﻴَﻮْﻡِ ﺍﻟْﺂﺧِﺮِ ﻭَﻟْﻴَﺸْﻬَﺪْ
ﻋَﺬَﺍﺑَﻬُﻤَﺎ ﻃَﺎﺋِﻔَﺔٌ ﻣِّﻦَ
ﺍﻟْﻤُﺆْﻣِﻨِﻴﻦَ
ব্যভিচারিণী নারী ব্যভিচারী পুরুষ;তাদের প্রত্যেককে একশ’ করে বেত্রাঘাত কর। আল্লাহর
বিধান কার্যকর কারণে তাদের প্রতি যেন তোমাদের মনে দয়ার উদ্রেক না হয়,যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাক।মুসলমানদের একটি দল যেন তাদের
শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।(সূরা নূর ২)
(Sahih International) The [unmarried]
woman or [unmarried] man found guilty
of sexual intercourse - lash each one of
them with a hundred lashes, and do not
be taken by pity for them in the religion
of Allah , if you should believe in Allah
and the Last Day. And let a group of the
believers witness their punishment.
Sahih Iinternational এখানে অর্থ unmarried করেছে তবে অন্যান্যরা ব্যভিচারীই রেখেছে।এখন আপনি বলবেন যে, এটা কিন্তু পরিষ্কার না যে, এটা বিবাহিতদের জন্য না অবিবাহিতদের জন্য।জ্বি আপনার কথা সঠিক এখানে স্পষ্ট না।তবে যেহেতু হাদিসে আছে অবিবাহিতদের শাস্তি ১০০ বেত্রাঘাত।এখানে তাহলে আপনাকে অর্থ অবিবাহিতই করতে হবে।এতে কুরআন এবং হাদিসের প্রকৃত সমন্বয় হবে।
আচ্ছা আরেকটা বিষয় এ আয়াতটি সকল ব্যভিচারীর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যাবে না।কারণ আল্লহ সূরা নিসার ২৪ নং আয়াতে দাসী ব্যভিচারীর শাস্তি স্বাধীন নারীর অর্ধেক করে দিয়েছেন।তাই উক্ত আয়াত দ্বারা যদি বলেন সকল ব্যভিচারীর শাস্তি ১০০ বেত্রাঘাত তাহলে কি বলবেন দাসীর শাস্তিও ১০০ বেত্রাঘাত? নিশ্চয় না।

(২নং প্রশ্নঃ) সূরা নিসার ২৫ নম্বর আয়াতে বিবাহিত দাসীর শাস্তি স্বাধীন নারীর অর্ধেক বলা হচ্ছে।কিন্তু রজমের অর্ধেক হয় কীভাবে?
আল্লাহপাক বলেছেন-
ﻭَﻣَﻦْ ﻟَﻢْ ﻳَﺴْﺘَﻄِﻊْ ﻣِﻨْﻜُﻢْ ﻃَﻮْﻟًﺎ ﺃَﻥْ ﻳَﻨْﻜِﺢَ ﺍﻟْﻤُﺤْﺼَﻨَﺎﺕِ
ﺍﻟْﻤُﺆْﻣِﻨَﺎﺕِ ﻓَﻤِﻦْ ﻣَﺎ ﻣَﻠَﻜَﺖْ ﺃَﻳْﻤَﺎﻧُﻜُﻢْ ﻣِﻦْ ﻓَﺘَﻴَﺎﺗِﻜُﻢُ ﺍﻟْﻤُﺆْﻣِﻨَﺎﺕِ
ﻭَﺍﻟﻠَّﻪُ ﺃَﻋْﻠَﻢُ ﺑِﺈِﻳﻤَﺎﻧِﻜُﻢْ ﺑَﻌْﻀُﻜُﻢْ ﻣِﻦْ ﺑَﻌْﺾٍ ﻓَﺎﻧْﻜِﺤُﻮﻫُﻦَّ ﺑِﺈِﺫْﻥِ
ﺃَﻫْﻠِﻬِﻦَّ ﻭَﺁَﺗُﻮﻫُﻦَّ ﺃُﺟُﻮﺭَﻫُﻦَّ ﺑِﺎﻟْﻤَﻌْﺮُﻭﻑِ ﻣُﺤْﺼَﻨَﺎﺕٍ ﻏَﻴْﺮَ
ﻣُﺴَﺎﻓِﺤَﺎﺕٍ ﻭَﻟَﺎ ﻣُﺘَّﺨِﺬَﺍﺕِ ﺃَﺧْﺪَﺍﻥٍ ﻓَﺈِﺫَﺍ ﺃُﺣْﺼِﻦَّ ﻓَﺈِﻥْ ﺃَﺗَﻴْﻦَ
ﺑِﻔَﺎﺣِﺸَﺔٍ ﻓَﻌَﻠَﻴْﻬِﻦَّ ﻧِﺼْﻒُ ﻣَﺎ ﻋَﻠَﻰ ﺍﻟْﻤُﺤْﺼَﻨَﺎﺕِ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﻌَﺬَﺍﺏِ
ﺫَﻟِﻚَ ﻟِﻤَﻦْ ﺧَﺸِﻲَ ﺍﻟْﻌَﻨَﺖَ ﻣِﻨْﻜُﻢْ ﻭَﺃَﻥْ ﺗَﺼْﺒِﺮُﻭﺍ ﺧَﻴْﺮٌ ﻟَﻜُﻢْ
ﻭَﺍﻟﻠَّﻪُ ﻏَﻔُﻮﺭٌ ﺭَﺣِﻴﻢٌ (25 )
"তোমাদের মধ্যে যারা স্বাধীন ও ঈমানদার নারী বিয়ে করার মত আর্থিক সঙ্গতি রাখে না,তারা নিজেদের অধিকারভুক্ত ঈমানদার ক্রীতদাসীদের
বিয়ে করবে। আল্লাহ তোমাদের ঈমান সম্পর্কে বেশী জানেন।তোমরা একে অপরের সমান।
সুতরাং তাদেরকে বিয়ে করবে তাদের মালিকের অনুমতি নিয়ে।তারা ব্যভিচারী অথবা উপপতি গ্রহণকারিণী না হয়ে সতী-সাধ্বী হয়ে থাকলে তাদের মোহরানা ন্যায় সঙ্গতভাবে দেবে। বিয়ের পর তারা যদি ব্যভিচার করে,তবে তাদের শাস্তি স্বাধীন নারীর অর্ধেক । এ ধরনের বিয়ে তাদের জন্যেই,যারা স্ত্রী না থাকার কারণে পাপে লিপ্ত
হতে পারে বলে ভয় করে। কিন্তু ধৈর্য ধরা ও স্বাধীন নারীদের বিয়ে করাই তোমাদের জন্য উত্তম।আল্লাহ ক্ষমাশীল এবং দয়ালু।" (৪:২৫)
(Sahih International) And whoever among you cannot [find] the means to marry free, believing women, then [he may marry] from those whom your right
hands possess of believing slave girls.
And Allah is most knowing about your
faith. You [believers] are of one another.
So marry them with the permission of
their people and give them their due
compensation according to what is
acceptable. [They should be] chaste,
neither [of] those who commit unlawful
intercourse randomly nor those who take [secret] lovers. But once they are
sheltered in marriage, if they should
commit adultery, then for them is half
the punishment for free [unmarried]
women. This [allowance] is for him
among you who fears sin, but to be
patient is better for you. And Allah is
Forgiving and Merciful.
Sahih International এ কিন্তু স্বাধিন নারীর অর্থ অবিবাহিত করা হয়েছে।
(Mohsin Khan) And whoever of you have
not the means wherewith to wed free,
believing women, they may wed
believing girls from among those
(captives and slaves) whom your right
hands possess, and Allah has full
knowledge about your Faith, you are one
from another. Wed them with the
permission of their own folk (guardians,
Auliya' or masters) and give them their
Mahr according to what is reasonable;
they (the above said captive and slave-
girls) should be chaste, not adulterous,
nor taking boy-friends. And after they
have been taken in wedlock, if they
commit illegal sexual intercourse, their
punishment is half that for free (unmarried) women. This is for him
among you who is afraid of being
harmed in his religion or in his body;
but it is better for you that you practise
self restraint, and Allah is oft forgiving,
Most Merciful.
এখানেও অবিবাহিত করা হয়েছে।বাকিগুলোতে কেবল free women করা হয়েছে।
http://corpus.quran.com/translation.jsp?chapter=4&verse=25
আর এখানে স্বাধীন নারী(4:25:44)l muḥ'ṣanāti এর অর্থ the free chaste women (refraining from sexual intercourse that is regarded as contrary to morality or religion; virtuous /virgin) করা হয়েছে।কোথাও এর অর্থ বিবাহিত দেখলাম না।আপনি প্রতি word এর অর্থ বিস্তারিতভাবে এখানে দেখতে পারেন।
http://corpus.quran.com/wordbyword.jsp?chapter=4&verse=25#(4:25:1)
এখানে দাসী বিবাহিত কিন্তু স্বাধীন নারী বিবাহিত নয়।যদি স্বাধীন নারী অবিবাহিতই হয় তাহলে দাসীর শাস্তি হবে ১০০/২=৫০ বেত্রাঘাত।এখানে স্বাধীন নারী মানে বিবাহিত যদি না হয় তাহলে তো রজমের প্রশ্নই আসে না।আর রজমের অর্ধেক করার কথা তো দূরেই থাক।
হাদিস দেখুনঃ
মুয়াত্তা মালিক, হাদীস নং-২৫৯৬
আব্দুল্লাহ ইবনে আইয়্যাস ইবনে আবি রবিয়া মাখযুমী (রা) বলেন: উমর ইবনে খাত্তাব (রা)
আমাকে এবং আরও কতিপয় কুরাইশী যুবককে ব্যভিচারের দায়ে প্রহার করতে আদেশ দিলে আমরা ব্যভিচারের শাস্তি হিসাবে বায়তুল মালের
দাসীদিগকে পঞ্চাশ পঞ্চাশ বেত্রাঘাত করতাম।
এবার আমি জোর দিয়েই বলছি এখানে স্বাধীন নারী অর্থ হলো অবিবাহিত নারী।কারণ এ আয়াতের পূর্বের অংশটাই তার প্রমাণঃ
"তোমাদের মধ্যে যারা স্বাধীন ও ঈমানদার নারী (free,believing women) বিয়ে করার মত আর্থিক সঙ্গতি রাখে না,তারা নিজেদের অধিকারভুক্ত ঈমানদার ক্রীতদাসীদের
বিয়ে করবে।
দেখুন ভালো করে- স্বাধীন ও ঈমানদার (free,
believing women) কে বিবাহ করতে বলা হচ্ছে।এখন যদি স্বাধীন নারী বিবাহিত হয় ; তাহলে কি বলবেন কুরআন বিবাহিত নারীকে আবার বিবাহ করতে বলছে?কিন্তু এ কি আদৌ সম্ভব! স্বাধীন নারী বলতে এখানে নিঃসন্দেহে অবিবাহিত নারীকে বুঝিয়েছে।কুরআন তো বিবাহিত নারীদের পুনরায় বিবাহ করতে বলবে না।সুতরাং এখানে স্বাধীন নারী বলতে অবিবাহিত নারীকে বোঝাচ্ছে।

তারপরও যদি আপনি মনে করেন ;না এখানে স্বাধীন নারী বলতে বিবাহিত নারীই বুঝিয়েছে তাহলেও একটা যুক্তি হয়তো দেয়া সম্ভব।
হাদিস অনুসারে অবিবাহিত ব্যভিচারীর শাস্তি কিন্তু কেবল বেত্রাঘাত নয়, তার সাথে এক বছরের নির্বাসনও কিন্তু আছে।
সহীহ বুখারী ২৪৭৩- ইয়াহইয়া ইবনু বুকায়র
(রহঃ) যায়দ ইবনু খালিদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবিবাহিত ব্যভিচারী সম্পর্কে একশ বেত্রাঘাত এবং এক বছরের নির্বাসনের নির্দেশদিয়েছেন।
আবার বিবাহিতদের শাস্তি কিন্তু শুধু রজম নয় বরং রজমের পূর্বে ১০০ বেত্রাঘাতের বিধানও আছে।
"ইয়াহইয়া ইবনে ইয়াহইয়া তামীমী (রঃ) রেওয়ায়েত করেছেন, উবাদাহ ইবনে ছামেত বলেন, রাসূল পাক এরশাদ করেছেন, তোমরা আমার নিকট হতে গ্রহণ কর।তোমরা আমার নিকট হতে গ্রহণ কর। তোমরা আমার নিকট
হতে গ্রহণ কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ পাক নারীদের জন্য একটি পথ বের করে দিয়েছেন। কোনো অবিবাহিত পুরুষ কোনো অবিবাহিতা নারীর
সাথে ব্যভিচার করলে একশ করে বেত্রাঘাত মার এবং এক বছরের জন্য দেশত্যাগী কর। আর
বিবাহিত পুরুষ কোনো বিবাহিতা নারীর
সাথে ব্যভিচার করলে তাঁদেরকে প্রথমে একশ
করে বেত্রাঘাত করে, তারপর প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা কর।"(সহি মুসলিম ৪২৬৯)
তবে বিজ্ঞ আলেমগণ বলেছেন, যদি ব্যভিচারী বিবাহিত হয় এক্ষেত্রে কেবল রজম করালেই হবে।কারণ অনেক হাদিস আছে সেখানে কেবল রজমের কথা আছে।তবে ইমাম আহমদ বলেছেন, বেত্রাঘাত এবং রজম দুইটায় করতে হবে।এতে আল্লহর কিতাব এবং নবীর সুন্নাত উভয়ের উপর আমল হবে।রজম করানো হচ্ছে নবীর সুন্নাত।অনেকটা দাঁড়ি রাখার মতো।তবে রজম করানো কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত কারণ হযরত উমর রাঃ কিন্তু রজম অস্বীকার কারীদের পথভ্রষ্ট বলেছেন।
যাই হোক মূল কথায় আসি।অবিবাহিতদের শাস্তির বিধান বেত্রাঘাত এবং নির্বাসন আর বিবাহিতদের বেত্রাঘাত এবং রজমের বিধান রয়েছে।
এবার ৪:২৫ আয়াতে স্বাধীন নারী যেহেতু অবিবাহিত সেহেতু দাসীর শাস্তি ১০০/২= ৫০ বেত্রাঘাত এবং ১/২=৬ মাসের নির্বাসন হওয়া উচিত ছিল।কিন্তু হাদিস থেকে দেখতে পারছি দাসীদের কেবল বেত্রাঘাত করা হয়েছে;কোনো নির্বাসন দেওয়া হয় নি।এমনকি ২য় কিংবা ৩য় ব্যভিচারেরও না।শুধু বেত্রাঘাত করা হয়েছে।আর ৪র্থ বেত্রাঘাতে তো বিক্রি করে দেবার কথা আছে।
দেখুনঃ সুনানে নাসাঈর মধ্যে আছে এবং সনদ সহীহ মুসলিমের সনদের উপরে রয়েছে যে,হযরত ইবাদ ইবনে তামীম (রঃ) তার চাচা বদরী সাহাবী হতে বর্ণিত যে, রসুলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ যখন দাসী ব্যভিচার করে তখন তাকে চাবুক মার, আবার করে তো আবার মার,পুনরায় ব্যভিচার করলে পুনরায় চাবুক মার,অত;পর তাকে বিক্রয় করে ফেল, যদি তার মুল্য একটি রশির তুল্যও হয়।
দাসীর ক্ষেত্রে চাবুক মারা ছাড়া অন্য কোন বিধান নেই,তাকে নির্বাসনও দেওয়া যাবে না।বার বার ব্যভিচারের শাস্তি চাবুক মারা আর অবশেষে তো বিক্রি করার কথা বলা হচ্ছে।বিজ্ঞদের মতও হলো এটাই যে, দাসীর ক্ষেত্রে চাবুক মারা ছাড়া অন্য কোন হাদ্দ জারি হবে না।
এখন স্বাধীন নারী যদি বিবাহিত হয় এবং আমরা পূর্বে জেনেছি তাদের শাস্তি ১০০ বেত্রাঘাত এবং রজম।সুতরাং যেহেতু অবিবাহিত স্বাধীন নারীর ক্ষেত্রে ১বছরের নির্বাসনের শাস্তির অর্ধেক দাসীর উপর জারি করা হয় না।ঠিক তেমনি স্বাধীন নারী বিবাহিত হলে রজমের শাস্তি তার উপর বর্তাবে না।তার শাস্তি কেবল ১০০/২= ৫০ বেত্রাঘাত হবে কারণ রাসূল সাঃ দাসীর উপর বেত্রাঘাত ছাড়া অন্য শাস্তি প্রয়োগ করতে নিষেধ করেছেন।এমনকি তাদের ভৎর্সনা করতেও নিষেধ করেছেন।সুতরাং এখানে রজমের কথা আসবেই না।ধর্ষিতার ক্ষেত্রে যেমন হাদ্দ প্রযোজ্য না,সমকামীর ক্ষেত্রে বিবাহিত-অবিবাহিতদের শাস্তি আলাদা নয় তেমনি দাসীর ক্ষেত্রে রজম প্রযোজ্য না।কারণ তাদের বেত্রাঘাত বাদে অন্য কোন শাস্তি নিষেধ।দাসী বিবাহ বন্ধনে আসার পর সে বিবাহিত।কিন্তু গুণে সে মুসানাতি তাকে বিবাহ বন্ধনে যেতে বলা হচ্ছে।অর্থ্যাৎ অবিবাহিত দাসী বিবাহ বন্ধনে এলে তার শাস্তি অবিবাহিত নারীর অর্ধেক।

(৩নং প্রশ্নঃ)
ﺍﻟﺰَّﺍﻧِﻲ ﻟَﺎ ﻳَﻨﻜِﺢُ ﺇﻟَّﺎ ﺯَﺍﻧِﻴَﺔً ﺃَﻭْ
ﻣُﺸْﺮِﻛَﺔً ﻭَﺍﻟﺰَّﺍﻧِﻴَﺔُ ﻟَﺎ ﻳَﻨﻜِﺤُﻬَﺎ
ﺇِﻟَّﺎ ﺯَﺍﻥٍ ﺃَﻭْ ﻣُﺸْﺮِﻙٌ ﻭَﺣُﺮِّﻡَ ﺫَﻟِﻚَ
ﻋَﻠَﻰ ﺍﻟْﻤُﺆْﻣِﻨِﻴﻦَ
ব্যভিচারী পুরুষ কেবল ব্যভিচারিণী নারী অথবা মুশরিকা নারীকেই বিয়ে করে এবং ব্যভিচারিণীকে কেবল ব্যভিচারী অথবা মুশরিক পুরুষই বিয়ে করে এবং এদেরকে মুমিনদের জন্যে হারাম করা হয়েছে।(সূরা নূর ৩)
এখানে বলা হচ্ছে ব্যভিচারী পুরুষ ব্যভিচারিণী নারীকেই বিবাহ করে।কিন্তু তাকে যদি রজম করা হয় তাহলে সে কিভাবে বিয়ে করবে? লাশের সাথে কি বিবাহ হয় আর আল্লহ তাওবা করলে মাফ করার কথা বলেছেন,তাহলে লাশ কিভাবে তওবা করবে?
খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।এখানে আল্লহ খবর দিচ্ছেন যে,ব্যভিচারীর উপর একমাত্র ঐ ব্যক্তিই খুশি হতে পারে যে নিজে ব্যভিচারী অথবা শিরককারী।একমাত্র মুশরিক কিংবা ব্যভিচারীই একাজকে খারাপ মনে করে না।মুমিন কখনো এ কাজ পছন্দ করে না।আল্লহ মুমিনদের জন্য ব্যবিচারী কিংবা ব্যভিচারিণীকে হারাম করেছে।কারণ সহিহ হাদিসে আছে একজন মানুষ যখন ব্যভিচার করে তখন সে আর মুমিন কিংবা ঈমানদার থাকে না।তার ঈমান জামা খোলার মতো উপর দিয়ে বের হয়ে যায়।আর ইবনে আব্বাস বলেন,এ আয়াতে নিকাহ বলতে সঙ্গম বোঝানো হয়েছে।অর্থ্যাৎ একজন ব্যভিচারী বা মুশরিকই কেবল একজন ব্যভিচারী বা ব্যভিচারিণীর সাথে সঙ্গম করে বা মিলিত হয়।অনেকে বলেছে এখানে কি তাহলে মহান আল্লহ মুশরিককে বিবাহের অনুমতি দিচ্ছে? উত্তর না।আমি যদি উক্ত আয়াতের মতো বলি "মুশরিকরা মূর্তি পূজা করে থাকে" তার মানে কি আমি মুশরিকদের মূর্তি পূজা করার নির্দেশ দিচ্ছি?আর এখানে নিকাহ বলতে সঙ্গম বুঝিয়েছে আর হাদিস অনুসারে একজন ব্যভিচার করলে তওবা না করা পর্যন্ত তো সে ঈমানদারই না।যাই হোক মূল বক্তব্যে আসিঃ

উক্ত আয়াতটি ভালো করে দেখুনঃ "ব্যভিচারী পুরুষ কেবল ব্যভিচারিণী নারী অথবা মুশরিকা নারীকেই বিয়ে করে"
এখানে বিয়ের পূর্বে নারী বা পুরুষকে ব্যভিচারী বা ব্যভিচারিণী বলে বিশেষণিত করা হচ্ছে।বিয়ে আগেই সে ব্যভিচারী এবং সে ব্যভিচারিণী বা মুশরিককে বিয়ে করে।আপনি বলছেন লাশ কিভাবে বিয়ে করবে? আপনি তো নিজেই স্বীকার করে নিচ্ছেন যে,আপনার লাশ অবিবাহিত।তাই তো তার বিয়ের প্রশ্ন আসছে।এখন প্রশ্ন আপনার লাশ যদি অবিবাহিতই হয় তাহলে এখানে তো রজমের প্রশ্নই আসছে না।আপনার লাশ অবিবাহিত হলে তো তার শাস্তি মৃত্যুদন্ড না।তার শাস্তি ১০০ বেত্রাঘাত এবং তারপর সে বিয়ে করতে পারবে।রজম তো বিবাহিতদের জন্য; আপনার যদি বিবাহিতই হয় তাহলে বিয়ে কীভাবে করবে এ প্রশ্ন আসছে কেন?
আবার অনেকে বলে এখানে পরিতক্তা নারীর কথা বলা হতে পারে যাদের স্বামী ব্যভিচার প্রমাণ করতে পারে নি তাই স্ত্রীকে তালাক দিয়েছে।আর পরিতক্তা নারীর তো বিবাহ হয়।
এ কথার উত্তর খুব সহজ।উপরে যদি পরিতক্তা নারীর কথা বোঝায় তাহলে তো পরিতক্তা পুরুষের কনসেপ্টও আসে।পরিতক্তা পুরুষ বলে কিছু আছে কি? আর আপনি বললেন স্বামী ব্যভিচার প্রমাণ করতে পারে নি বলে তালাক দিয়েছে।আর এমন নারীর তো বিয়ে হয়।জ্বি তা হয়।কিন্তু জনাব আপনি তো স্বীকার করেই নিলেন যে স্বামী ব্যভিচার প্রমাণ করতে পারে নি।আর অপ্রমাণিত ব্যভিচারের তো কোনো শাস্তিই নেই।রজমের কথা আসে কিভাবে?
আর এখানে সেই সব ব্যভিচারীদের কথা হয়তো বোঝানো হয়েছে,যাদের ব্যভিচার প্রমাণিত নয় কিংবা গোপন রয়েছে।
এবার প্রশ্ন হলো রজম করালে লাশ তওবা করবে কিভাবে?
এ প্রশ্নটা অযৌক্তিক।বিষয় যেন এমন যে ব্যভিচার করার সাথে সাথে তাকে শাস্তি দেওয়া হয়।ব্যভিচার প্রমাণ করতে হবে,সাক্ষী যোগার করতে হবে।ব্যভিচারী অনেক সময় পাবে তওবা করার।আর তওবা করলে যে শাস্তি হবে না এটা ভুল।আপনি তওবা করেছেন এবং যদি ব্যভিচারের কথা গোপন রাখতে পারেন,তাহলে আপনার কোনো শাস্তি নেই।কিন্তু প্রকাশিত হলে নিশ্চিত শাস্তি পেতে হবে।
দেখুনঃ হযরত আব্দুল্লাহ বিন উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) বলেন- তোমরা ব্যভিচার থেকে দূরে থাকো যা আল্লহ তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।এরপরও যে শয়তানের পড়ে তা করে ফেলে সে যেন তা লুকিয়ে রাখে। যখন আল্লহ তা গোপনই রেখেছেন।তবে সে যেন এ জন্য আল্লহ তালার নিকট তাওবা করে নেয়। কারণ যে ব্যক্তি তা আমাদের নিকট প্রকাশ করে তার উপর আমরা অবশ্যই আল্লহ তালার বিধান প্রয়োগ করবো। (হাকিম ৪/২৭২)
আর তওবা করার পরও নবী শাস্তি দিয়েছেন।
দেখুনঃ(সহিহ বুখারী৪২৮৩) আবূ বাকর ইবনু আবূ শায়বা ও মুহাম্মাদ ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু নূমায়র (রহঃ) বুরায়দা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে,গামেদী এক মহিলা আগমন করলো এবং বলল, হে আল্লার রাসুল! আমি ব্যভিচার করেছি।
সুতরাং আপনি আমাকে পবিত্র করুন। তখন
তিনি তাঁকে ফিরিয়ে দিলেন।-পরবর্তী দিন আবার ঐ মহিলা আগমন করলো এবং বলল,
হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম!আপনি কেন আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন।আপনি কি আমাকে ঐভাবে ফিরিয়ে দিতে চান,যেমনভাবে আপনি ফিরিয়ে দিয়ে ছিলেন মায়েযকে। আল্লাহর শপথ করে বলছি, নিশ্চয়ই আমি গর্ভবতী। তখন তিনি বললেনঃতুমি যদি ফিরে যেতে নাচাও,তবে আপাততঃ এখনকার মত চলে যাও এবং প্রসবকাল সময় পর্যন্ত অপেক্ষা কর।রাবী বলেনঃ এরপর যখন সে সন্তান প্রসব করল- তখন
তিনি সন্তানকে এক টূকরা কাপড়ের মধ্যে নিয়ে তাঁর কাছে আগমন করলেন এবং বললেনঃ এই
সন্তান আমি প্রসব করেছি। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ যাও
তাকে (সন্তানকে) দুধ পান করাও গিয়ে। দুধপান করানোর সময় উত্তীর্ণ হলে পরে এসো।এরপর যখন তার দুধপান করানোর সময় শেষ হল তখন ঐ মহিলা শিশু সন্তানটিকে নিয়ে তার কাছে আগমন করলো এমন অবস্থায় যে, শিশুটির
হাতে এক টূকরা রুটি ছিল।এরপর বললো, হে আল্লাহর নাবী! এইতো সেই শিশু-যাকে আমি দুধপান করানোর কাজ শেষ করেছি। সে এখন
খাদ্য খায়। তখন শিশু সন্তানটিকে তিনি কোন
একজন মুসলমানকে প্রদান করলেন। এরপর তার
প্রতি ( ব্যভিচারের শাস্তি) প্রদানের নির্দেশ দিলেন।মহিলার বক্ষ পর্যন্ত গর্ত খনন করানো হল এরপর জনগণকে (তার প্রতি পাথর নিক্ষেপের) নির্দেশ দিলেন। তারা তখন তাকে পাথর মারতে শুরু করল।খালিদ ইবনু ওয়ালীদ (রাঃ) একটি- পাথর নিয়ে অগ্রসর হলেন এবং মহিলার মাথায়
নিক্ষেপ করলেন, তাতে রক্ত ছিটকে পড়লো খালিদ (রাঃ) এর মুখমণ্ডলে। তখন তিনি মহিলাকে গালি দিলেন।নাবী সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম গালি শুনতে পেলেন।
তিনি বললেনঁ, সাবধান!হে খালিদ! সেই মহান
আল্লাহর শপথ, যার হস্তে আমার জীবন, জেনে রেখো!নিশ্চয়ই সে এমনতাওবা করেছে, যদি কোন ‘হক্কুল ইইবাদ" বিনষ্টকারী ব্যক্তিও এমন
তাওবা করতো- তবে তারও ক্ষমা হয়ে যেতো। এরপর তার জানাযার সালাত আদায়ের নির্দেশ দিলেন। তিনি তার জানাযায় সালাত আদায়
করলেন। এরপর তাকে দাফন করা হলো।
দেখুন মহিলা কিন্তু তওবা করেছিল তবুও তাকে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল কারণ তার পাপ প্রকাশিত হয়েছিল।সে স্বীকার করেছিল।তাই যদি পাপ গোপণ রাখতে পারেন,তাহলে কোনো শাস্তি নেই।

প্রশ্ন নং ৪) আল্লহ সূরা আহযাবে নবীপত্নীদের অশ্লীল কর্মের জন্য দ্বিগুণ শাস্তির কথা বলেছেন।যদি নবী পত্নিরা ব্যভিচার করে তাহলে রজমের দ্বিগুণ শাস্তি কিভাবে হবে?
ﻳَﺎ ﻧِﺴَﺎﺀ ﺍﻟﻨَّﺒِﻲِّ ﻣَﻦ ﻳَﺄْﺕِ
ﻣِﻨﻜُﻦَّ ﺑِﻔَﺎﺣِﺸَﺔٍ ﻣُّﺒَﻴِّﻨَﺔٍ
ﻳُﻀَﺎﻋَﻒْ ﻟَﻬَﺎ ﺍﻟْﻌَﺬَﺍﺏُ ﺿِﻌْﻔَﻴْﻦِ
ﻭَﻛَﺎﻥَ ﺫَﻟِﻚَ ﻋَﻠَﻰ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﻳَﺴِﻴﺮًﺍ
হে নবী পত্নীগণ! তোমাদের মধ্যে কেউ প্রকাশ্য
অশ্লীল কাজ করলে তাকে দ্বিগুণ
শাস্তি দেয়া হবে। এটা আল্লাহর জন্য সহজ।(সূরা আহযাব ৩০)
রজম বাতিলের পক্ষে এটা আমার সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত আয়াত বলে মনে হয়।তবে এ আয়াত দ্বারাও রজম বাতিল হয় না।
এখানে প্রকাশ্যে অশ্লীল কর্মের কথা বলা হচ্ছে কিন্তু ব্যভিচার কিন্তু প্রকাশ্য পাপ নয়।এটা গোপনে করা হয়।তবুও যুক্তির খাতিরে মেনে নিলাম।কিন্তু এখানে দ্বিগুণ শাস্তির কথা বলা হচ্ছে।এখন ব্যভিচারের শাস্তি যদি শুধু ১০০ বেত্রাঘাত হয় তাহলে কি নবী পত্নিদের শাস্তি ২০০ বেত্রাঘাত? কিন্তু এটা তো সূরা নূরের ২ আয়াতের বরখেলাফ।কারণ উক্ত আয়াতে ব্যভিচারীর শাস্তি ১০০ বলা হয়েছে।তাহলে এ দ্বিগুণ শাস্তি কখন?
জবাব হচ্ছে এ দ্বিগুণ শাস্তি ইহকালে নয় বরং পরকালের।এ আয়াতের পূর্বের আয়াতগুলো দেখুনঃ ﻳَﺎ ﺃَﻳُّﻬَﺎ ﺍﻟﻨَّﺒِﻲُّ ﻗُﻞ ﻟِّﺄَﺯْﻭَﺍﺟِﻚَ
ﺇِﻥ ﻛُﻨﺘُﻦَّ ﺗُﺮِﺩْﻥَ ﺍﻟْﺤَﻴَﺎﺓَ ﺍﻟﺪُّﻧْﻴَﺎ
ﻭَﺯِﻳﻨَﺘَﻬَﺎ ﻓَﺘَﻌَﺎﻟَﻴْﻦَ ﺃُﻣَﺘِّﻌْﻜُﻦَّ
ﻭَﺃُﺳَﺮِّﺣْﻜُﻦَّ ﺳَﺮَﺍﺣًﺎ ﺟَﻤِﻴﻠًﺎ
হে নবী, আপনার পত্নীগণকে বলুন,তোমরা যদি পার্থিব জীবন ও তার বিলাসিতা কামনা কর, তবে আস, আমি তোমাদের ভোগের ব্যবস্থা করে দেই এবং উত্তম পন্থায় তোমাদের বিদায় নেই।(২৮)
ﻭَﺇِﻥ ﻛُﻨﺘُﻦَّ ﺗُﺮِﺩْﻥَ ﺍﻟﻠَّﻪَ
ﻭَﺭَﺳُﻮﻟَﻪُ ﻭَﺍﻟﺪَّﺍﺭَ ﺍﻟْﺂﺧِﺮَﺓَ ﻓَﺈِﻥَّ
ﺍﻟﻠَّﻪَ ﺃَﻋَﺪَّ ﻟِﻠْﻤُﺤْﺴِﻨَﺎﺕِ ﻣِﻨﻜُﻦَّ
ﺃَﺟْﺮًﺍ ﻋَﻈِﻴﻤًﺎ
পক্ষান্তরে যদি তোমরা আল্লাহ, তাঁর রসূল ও
পরকাল কামনা কর, তবে তোমাদের সৎকর্মপরায়ণদের জন্য আল্লাহ মহা পুরস্কার
প্রস্তুত করে রেখেছেন।(২৯)
দেখুন পরকালে তাদের মহাপুষ্কার দেওয়ার কথা বলে অশ্লীল কর্মের জন্য দ্বিগুণ শাস্তির কথা বলছে।সুতরাং এ শাস্তি ইহকালের নয় বরং পরকালের। আরো প্রমাণ দেওয়া সম্ভব যে এ শাস্তি ইহকালের নয় বরং পরকালের।
ﻭَﻗَﺎﻟُﻮﺍ ﺭَﺑَّﻨَﺎ ﺇِﻧَّﺎ ﺃَﻃَﻌْﻨَﺎ ﺳَﺎﺩَﺗَﻨَﺎ
ﻭَﻛُﺒَﺮَﺍﺀﻧَﺎ ﻓَﺄَﺿَﻠُّﻮﻧَﺎ ﺍﻟﺴَّﺒِﻴﻠَﺎ
তারা আরও বলবে, হে আমাদের পালনকর্তা,
আমরা আমাদের নেতা ও বড়দের কথা মেনেছিলাম,
অতঃপর তারা আমাদের পথভ্রষ্ট করেছিল।
ﺭَﺑَّﻨَﺎ ﺁﺗِﻬِﻢْ ﺿِﻌْﻔَﻴْﻦِ ﻣِﻦَ
ﺍﻟْﻌَﺬَﺍﺏِ ﻭَﺍﻟْﻌَﻨْﻬُﻢْ ﻟَﻌْﻨًﺎ ﻛَﺒِﻴﺮًﺍ
হে আমাদের পালনকর্তা! তাদেরকে দ্বিগুণ
শাস্তি দিন এবং তাদেরকে মহা অভিসম্পাত করুন।(সূরা আহযাব ৬৭-৬৮)
দেখুন এখানে পরকালের দ্বিগুণ শাস্তির কথা স্পষ্ট।তারপরে পরকালে ব্যভিচারের শাস্তিই দ্বিগুণ দেওয়া হবে একথা আল্লহ কুরআনে বলেছেন।
দেখুনঃ সূরা ফুরকান (৬৭-৬৮) " এবং যারা আল্লাহর সাথে অন্য উপাস্যের এবাদত করে না, আল্লাহ যা হত্যা অবৈধ করেছেন, সঙ্গত কারণ ব্যতীত তাকে হত্যা করে না এবং ব্যভিচার করে না। যারা একাজ করে, তারা শাস্তির সম্মুখীন হবে।
ﻳُﻀَﺎﻋَﻒْ ﻟَﻪُ ﺍﻟْﻌَﺬَﺍﺏُ ﻳَﻮْﻡَ ﺍﻟْﻘِﻴَﺎﻣَﺔِ ﻭَﻳَﺨْﻠُﺪْ ﻓِﻴﻪِ ﻣُﻬَﺎﻧًﺎ
কেয়ামতের দিন তাদের শাস্তি দ্বিগুন হবে এবং তথায় লাঞ্ছিত অবস্থায় চিরকাল বসবাস করবে।
ﺇِﻟَّﺎ ﻣَﻦ ﺗَﺎﺏَ ﻭَﺁﻣَﻦَ ﻭَﻋَﻤِﻞَ ﻋَﻤَﻠًﺎ ﺻَﺎﻟِﺤًﺎ ﻓَﺄُﻭْﻟَﺌِﻚَ ﻳُﺒَﺪِّﻝُ ﺍﻟﻠَّﻪُ
ﺳَﻴِّﺌَﺎﺗِﻬِﻢْ ﺣَﺴَﻨَﺎﺕٍ ﻭَﻛَﺎﻥَ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻏَﻔُﻮﺭًﺍ ﺭَّﺣِﻴﻤًﺎ
সুতরাং এখানে স্পষ্ট এ শাস্তি ইহকালের নয় বরং পরকালের।

(প্রশ্ন নং ৫) রজমের আয়াত কুরআনে নেই।ইবনে মাজহায় হাদিস আছে যে, ছাগল রজমের আয়াত খেয়ে ফেলেছে? এ থেকে বোঝা যায় রজমের বিধান আর কার্যকর নেই।
রজমের আয়াত কুরআনে ছিল।কিন্তু পরে তার তিলাওয়াত রহিত হয় তবে তার বিধান আজও বর্তমান আছে।ইমাম নববী এবং হাফেজ হাজর আসকালী সকলেই বলেছেন, এ আয়াতের তিলাওয়াত রহিত হয়েছে তবে এর বিধান আজও বর্তমান।নিচের হাদিসগুলো দ্বারা এ বিষয়গুলো আরো স্পষ্ট হবে।
(বুখারী-৬৮২৯,মুসলিম-১৬৯১,আবু দাউদ-৪৪১৮) আছে।
"হযরত উমর (রাঃ) তার এক দীর্ঘ খুতবায় বলেন,নিশ্চয় আল্লহ তা'আলা মুহাম্মদ (সাঃ) কে সত্য ধর্ম দিয়ে পাঠিয়েছেন এবং তার উপর কুরআন অবতীর্ণ করেছেন।আল্লহ তা'আলা তার উপর যা অবতীর্ণ করেন তার মধ্যে রজমের আয়াতও ছিল।আমরা তা পড়েছি,মুখস্ত করেছি ও বুঝেছি।অতঃপর রাসূল (সাঃ) রজম করেছেন এবং আমরাও তার ইন্তেকালের পর রজম করেছি।আশঙ্কা হয় বহু কাল পর কেউ বলবেঃ আমরা কোরআন মাজীদে রজম পাইনি।অতঃপর তারা আল্লহ তা'আলার পক্ষ থেকে নাযিলকৃত একটি ফরয কাজ ছেড়ে পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে।হযরত উমর (রাঃ) যে আয়াতের ইঙ্গিত করেছেন তা হচ্ছে,"বয়স্ক (বিবাহিত) পুরুষ ও মহিলা যখন ব্যভিচার করে তখন তোমরা তাদেরকে সন্দেহাতীতভাবে পাথর মেরে হত্যা করবে।এটিই হচ্ছে আল্লহ তালার পক্ষ থেকে তাদের জন্য শাস্তিস্বরুপ এবং আল্লহ তালা পরাক্রমশালী ও সুকৌশলী।
উক্ত আয়াতের তিলাওয়াত রহিত হয়েছে।তবে উহার বিধান চালু রয়েছে।
হযরত উমর (রাঃ) এর হাদিস থেকে আমরা বুঝতে পারছি যে,আয়াতটি মানসুক বা রহিত হয়েছে।এখন এ রহিত আয়াত যদি ছাগলে খায়,তাহলে কুরআনের বিশুদ্ধতার কি পরিবর্তন আসে বলুন।রহিত আয়াত ছাগলে খেল কি গরুতে খেল এতে কি আসে যায় বলুন।মূল কুরআনের তো কোনো ক্ষতি হয় নি।এটাই কুরআনের বিশুদ্ধতার প্রমান।আর যদি ছাগলে নাও খেত,তাহলে কুরআন সংকলনের সময় হয়তো এগুলো পুড়িয়ে দেওয়া হতো।
এ থেকে আরো প্রমাণ পাওয়া যায় যে, রজমের নির্দেশ কখনো বাতিল হয় নি।কারণ উমর রাঃ নিজে বলেছেন যে, "রাসূল (সাঃ) রজম করেছেন এবং আমরাও তার ইন্তেকালের পর রজম করেছি।" এ থেকে স্পষ্ট যে, রজম কখনো বাতিল হয় নি।আর উনি বলেছেন, রজম অস্বীকারকারীরা পথভ্রষ্ট।এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, রজম করানো একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত।
আরো হাদিস দেখুনঃ
১) "হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ রাঃ হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত উমর রাঃ কে বলতে শুনেছেনঃ " লোকেরা বলে যে,তারা রজম করার কথা কুরআনে পাই না।কুরআনে কেবল চাবুক মারার হুকুম রয়েছে।জেনে রেখো যে, স্বয়ং রাসূল সাঃ রজম করেছেন,তারপর আমরাও করেছি।
" কুরআন যা নেই, উমর রাঃ তা লিখিয়ে নিয়েছেন" এ কথার ভয় যদি আমি না করতাম তবে রজমের আয়াত আমি লিখিয়ে নিতাম যেভাবে ওটা অবতীর্ণ হয়েছিল।(মুসনাদে আহমদ)
২) হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়ার রাঃ হতে বর্ণিত যে, হযরত উমর রাঃ বলেছেন, " তোমরা রজমের হুকুম অস্বীকার করার ধ্বংস থেকে বেঁচে থাকো।(ইমাম আহমদ বর্ণনা করেছেন,ইমাম তিরমিযী রাঃ এটা আনয়ন করেছেন এবং বিশুদ্ধ বলেছেন)

৩) কাসীর ইবনে সালত রাঃ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,আমরা মারওয়ানের নিকট উপবিস্ট ছিলাম।সেখানে হযরত যায়েদ ইবনে সাবিতও ছিলেন।তিনি বলেনঃ "আমরা কুরআনে পড়তাম- বিবাহিত পুরুষ বা নারী ব্যভিচার করলে তোমরা অবশ্যই রজম করবে।" মারওয়ান তখন জিজ্ঞেস করেন," আপনি কুরআন কারীমে এটা লিখেন না যে? উত্তরে তিনি বলেনঃ আমাদের উমর রাঃ বলেন, আমি তোমাদের স্বান্তনা দিচ্ছি যে, একটি লোক একদা নবী সাঃ এর কাছে আগমন করে।সে তার সামনে এরুপ বর্ণনা দেয়।আর সে রজমের বর্ণনা দেয়।কে একজন বলে, হে রাসূল সাঃ আপনি রজমের আয়াত লিখিয়ে নিন।রাসূল সাঃ বলেন আমি তো এটা লিখিয়ে নিতে পারি না।(আহমদ ও নাসাঈ)
বিস্তারিতঃ http://www.islamic-life.com/other-refutations/quran/article-missing-quranic-verse-rajam-stoning
এসব হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, রজমের আয়াত পূর্বে লিখিত ছিল।তারপর তিলাওয়াত রহিত হয় তবে হুকুম বাকি আছে।

(৬ নং প্রশ্নঃ) রজমের আয়াত যদি রহিত হয় তাহলে তার স্বরুপ কিংবা ঐ রকম কোনো আয়াত কুরআনে থাকা উচিত।কারণ আল্লহ বলেন, “আমি কোন আয়াত রহিত করলে অথবা বিস্মৃত করিয়ে দিলে তদপেক্ষা উত্তম অথবা তার সমপর্যায়ের আয়াত আনয়ন করি। তুমি কি জান না যে,আল্লাহ সব কিছুর উপর শক্তিমান?” [ সূরা বাকারা-১০৬]
যেমন, প্রথমে ব্যভিচারিণীদের গৃহ বন্দি করতে বলা হয় (৪:১৫) পরে বেত্রাঘাতের নির্দেশ আসে(নূর ২)।কিন্তু রজমের পর্যায়ের কোনো আয়াত নেই?
এটা অনেক ভালো যুক্তি।তবে এখানে বুঝতে হবে দাবিটা কি? দাবি হচ্ছে কেবল তিলাওয়াত রহিতকরণের কিন্তু এর বিধান তো বর্তমান।আল্লহ কোনো বিধান বাতিল করলে তার সমপর্যায়ের বিধান আনেন।কিন্তু হাদিস থেকে পরিষ্কার রজমের বিধান তো বাতিলই হয় নি।তাহলে তো নতুন বিধান আনার কোনো প্রয়োজন নেই।যেমন- আগে ব্যভিচারিণীদের গৃহ বন্দি করতে বলা হয় (৪:১৫) পরে বেত্রাঘাতের নির্দেশ আসে(নূর ২)।আর আল্লহ তো কেবল আয়াত রহিত করেন না,বরং বিস্মৃতও করেন।এখানেও তাই হয়েছে।সূরা আলা (৬-৭)
ﺳَﻨُﻘْﺮِﺅُﻙَ ﻓَﻠَﺎ ﺗَﻨﺴَﻰ
আমি আপনাকে পাঠ
করাতে থাকব, ফলে আপনি বিস্মৃত
হবেন না
ﺇِﻟَّﺎ ﻣَﺎ ﺷَﺎﺀ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﺇِﻧَّﻪُ ﻳَﻌْﻠَﻢُ
ﺍﻟْﺠَﻬْﺮَ ﻭَﻣَﺎ ﻳَﺨْﻔَﻰ
আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন তা ব্যতীত।
নিশ্চয় তিনি জানেন প্রকাশ্য ও
গোপন বিষয়।
এ আয়াতে তিলাওয়াত রহিত হয় কথাটি স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
আর কুরআনেও রজমের কাছাকাছি একটি আয়াত আছে।
ﻭَﺍﻟﻠَّﺬَﺍﻥَ ﻳَﺄْﺗِﻴَﺎﻧِﻬَﺎ ﻣِﻨﻜُﻢْ
ﻓَﺂﺫُﻭﻫُﻤَﺎ ﻓَﺈِﻥ ﺗَﺎﺑَﺎ ﻭَﺃَﺻْﻠَﺤَﺎ
ﻓَﺄَﻋْﺮِﺿُﻮﺍْ ﻋَﻨْﻬُﻤَﺎ ﺇِﻥَّ ﺍﻟﻠّﻪَ ﻛَﺎﻥَ
ﺗَﻮَّﺍﺑًﺎ ﺭَّﺣِﻴﻤًﺎ
তোমাদের মধ্য থেকে যে দু’জন সেই
কুকর্মে লিপ্ত হয়, তাদেরকে শাস্তি প্রদান কর। অতঃপর যদি উভয়ে তওবা করে এবং নিজেদের
সংশোধন করে, তবে তাদের থেকে হাত গুটিয়ে নাও। নিশ্চয় আল্লাহ তওবা কবুলকারী, দয়ালু।
“If two men among you are guilty
of lewdness, punish them both. If
they repent and amend, Leave
them alone; for Allah is Oft-
returning, Most Merciful.”
— Qur'an, Sura 4 (Al-Nisa), ayat16
এ আয়াতে সমকামীদের ব্যাপারে উল্লেখ করা হয়।আর উক্ত আয়াতে তাদের শাস্তির কথা বলা হচ্ছে।তবে এ শাস্তির কথা কুরআনে নেই,হাদিসে আছে।আর সেটা হলো রজম।সমকামীদের ব্যাপারে কিন্তু বিবাহিত- অবিবাহিত হওয়ার ব্যাপার নেই।সমকাম করে ধরা পড়লেই রজম।
দেখুনঃ Narrated Abdullah ibn Abbas: The
Prophet said: If you find anyone
doing as Lot's people did, kill
the one who does it, and the one
to whom it is done.
— Sunan Abu Dawood, 38:4447

Narrated Abdullah ibn Abbas: If a
man who is not married is seized
committing sodomy , he will be
stoned to death.
— Sunan Abu Dawood, 38:4448
তাহলে বলুন কিভাবে রজম কুরআন বিরোধী হয়!
আল্লহর রাসূল নির্দেশ দিয়েছে তাই এটা মেনে নেওয়া আমাদের কর্তব্য।কারণ আল্লহ বলেন- ‘রাসূল তোমাদের যা দেয় তা গ্রহণ কর,
আর যা থেকে সে তোমাদের নিষেধ
করে তা থেকে বিরত হও
এবং আল্লাহকেই ভয় কর, নিশ্চয় আল্লাহ
শাস্তি প্রদানে কঠোর।’ {সূরা আল-হাশর,
আয়াত : ০৭}


তবে আমি তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি পাকিস্তানের এ ঘটনার।পাকিস্তানে এ কেমন ফতোয়া? ধর্ষণিতাকে কেন ৪ জন সাক্ষী আনতে হবে? আর ধর্ষিতা সাক্ষী আনতে পারে না কিন্তু ব্যভিচারের উপকরণ তার কাছে পাওয়ার কারণে তাদের শাস্তি পেতে হয়।
The number of incidents of violence
against women increased by 13 per
cent in 2009 , says a report by the Aurat
Foundation set to be released on
Wednesday. The report states that
8,548 incidents of violence against
women were reported in 2009
compared to 7,571 incidents reported
in 2008. Of these, 5,722 were reported
to have occurred in Punjab, followed by
1,762 in Sindh, 655 in Khyber-
Pakhtunkhwa and 237 in Balochistan.
Similarly, 172 cases of violence against
women were reported in Islamabad, the
report said.
2009 In Pakistan, it is reported that three out of four women in prison under its Hudud laws [these are the laws of what it forbidden and permitted by Allah
himself], are rape victims . Because
rape is equated with zina [unlawful
sexual intercourse] under Hudud law,
rape victims are required to produce
four pious male witnesses. It is of
course nearly impossible for the rape
victims to produce the four male
witnesses required to prove their
allegation. Therefore their police report
of rape was taken as a confession of
illicit sex on their part and they were
duly found guilty.

পাকিস্তানে কি নিচের হাদিসগুলো পৌছায় নি?
(মুয়াত্তা মালিক, হাদীস নং-২৫৯৫) নাফি’ (রা) হতে বর্ণিত আছে যে, গনীমতের এক পঞ্চমাংশের মালের মধ্যে যে সকল দাস-দাসী ছিল তাদের মধ্যে এক দাস এক দাসীর
সহিত বলপুর্বক ব্যভিচার করেছিল ।উমর (রা) তাকে বেত্রাঘাত করে তাড়াইয়া দিলেন (কিন্ত)
তিনি দাসীকে প্রহার করলেন না ।কারণ তার উপর বল প্রয়োগ করা হয়েছিল।
সাহাবী ওয়ায়েল ইবনে হুাজর (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এর যুগে জনৈকা মহিলা মসজিদে ছালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে বের হন।
একজন লোক তাকে একা পেয়ে কাপড়ে ঢেকে নেয় এবং তাকে ধর্ষণ করে। মহিলা চিৎকার শুরু করলে লোকটি চলে যায়। সেখান
দিয়ে মুহাজিরদের একদল লোক যাচ্ছিলেন। মহিলাটি তাদেরকে বললেন যে,
ঐ লোক আমার সাথে এরূপ আচরণ করেছে। তখন লোকেরা তাকে ধরে রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকটে নিয়ে আসলে মহিলাটি তার ধর্ষককে চিনতে পারে। এরপর রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঐ মহিলাকে বললেন, তুমি চলে যাও। আল্লাহ
তোমাকে ক্ষমা করুন। অতঃপর রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঐ ধর্ষণকারী পুরুষকে রজম করার আদেশ
দিলেন (আবুদাঊদ হা/৪৩৭৯; তিরমিযী হা/১৪৫৪, মিশকাত হা/৩৫৭২,
হাদীছটি হাসান, ‘হুদূদ’ অধ্যায়)।

শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

পরিপূর্ণ পর্দা না করার পেছনে অধুনা মুসলিম নারীদের ১০টি অজুহাত এর জবাব

কেন পর্দা করেন না? প্রশ্নটি করা হয়েছিল সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার নারীদের কাছে। যেসব কারণ তারা দেখিয়েছেন, সেগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ দশটি কারণ আমরা চিহ্নিত করেছি। চেষ্টা করেছি এগুলোর উত্তর খোঁজার। কারণগুলো নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করে আমরা খুঁজে পেয়েছি এসব অজুহাতগুলোর দুর্বলতা।
প্রিয় মুসলিম বোন, আমাদের এই গবেষণা-পুস্তিকায় আমরা গুরুত্ব অনুসারে সেসব কারণ এবং সংক্ষেপে এই কারণগুলোর ব্যাপারে আমাদের আলোচনা উপস্থাপন করেছি। যারা পরিপূর্ণ পর্দার ব্যাপারে আগ্রহী নন, কিংবা পর্দার গুরুত্ব বোঝা সত্ত্বেও বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক কারণে পর্দা শুরু করতে পারছেন না আশা করি সবার জন্যই এই লেখাটি কাজে দেবে।


এক নজরে দশটি কারণ:


১. হিজাবের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আমি এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নই।২. ইসলামিক পোশাকের ব্যাপারে আমার কোনো আপত্তি নেই। তবে আমার বাবা-মা আমাকে হিজাব পড়তে বারণ করেন। বাবা-মা’র নিষেধাজ্ঞা না মানলে আমি কি জাহান্নামে যাব না?৩. আসলে আমি যাদের সাথে যে সমাজে চলাফেরা করি, সেখানে আমার বর্তমান ড্রেসআপ বাদ দিয়ে ইসলামিক পোশাক মেনে চলা সম্ভব না।৪. এত গরম আমাদের দেশে, একদমই সহ্য করতে পারি না। এত গরমে কীভাবে হিজাব করব?৫. আমার ভয় হয়, আমি হয়তো আজকে হিজাব করে কাল আবার ছেড়ে দেব। কারণ, আমি অনেককেই দেখেছি হিজাব করে আবার ছেড়ে দিতে!৬. হিজাব করলে কেউ আমাকে বিয়ে করবে না। তাই, বিয়ে করার আগ পর্যন্ত আমি হিজাব করব না।৭. সুন্দর রেশমি চুল আর আকর্ষণীয় যে সৌন্দর্য দিয়ে আল্লাহ আমাকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছেন আমি সেটা কীভাবে আবৃত রাখি?৮. আমি জানি পরিপূর্ণ পর্দা বা হিজাব করা নারীদের জন্য ফরজ, তবে আল্লাহ যখন আমাকে হেদায়েত করবে আমি তখনই হিজাব করব।বা বয়স হলে হজ করার পর পর্দা করব।১০. হিজাব বা পরিপূর্ণ পর্দা করলে লোকজন আমার গায়ে বিভিন্ন ইসলামিক দলের তকমা লাগিয়ে দেবে। আর আমি এসব দলাদলি মোটেও পছন্দ করি না।
◾অজুহাত ১
◾“হিজাবের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আমি এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নই।”
১. এই অজুহাত যিনি দেখান, তাঁকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় আপনি কি ইসলামের সত্যতার ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত? তাহলে স্বাভাবিকভাবেই এর উত্তর হবে, “হ্যাঁ”। কারণ, তিনি এই ঘোষণা দিয়েছেন যে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য উপাসনার যোগ্য নয়। এর মানে তিনি ইসলামিক বিশ্বাসের ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত। এরপর তিনি যখন বলেন,“মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” অর্থাৎ মুহাম্মাদ আল্লাহর বার্তাবাহক-রাসূল। এ কথার মধ্য দিয়ে তিনি ইসলামিক শারী‍‘আহ ও এর বিধিবিধানের ব্যাপারেও সম্পূর্ণরূপে বিশ্বাস স্থাপন করেন। অতএব বলা যায়, এই কালিমা যিনি ঘোষণা করেছেন দ্বীন বা জীবনব্যবস্থা হিসেবে তিনি ইসলামের সত্যতার ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত। তিনি বোঝেন যে ইসলামিক জীবনব্যবস্থাই সেই জীবনব্যবস্থা যার অনুসরণে একজন মানুষের জীবনের সকল কাজ সম্পন্ন হওয়া উচিত।
২. হিজাব কি ইসলামিক বিধিবিধান তথা শারী‍‘আহর অংশ? আর এটা কি নারীদের জন্য খুব দরকার?
আমাদের এই বোনটি যদি নিয়্যাতের ব্যাপারে সৎ ও আন্তরিক হন এবং সত্য জানার উদ্দেশ্যে বিষয়টি বিবেচনা করেন, তাহলেই বুঝতে পারবেন যে হিজাব বা পরিপূর্ণ পর্দা অবশ্যই ইসলামিক শারী‍‘আহর অংশ এবং নারীদের জন্য এটা অবশ্যপালনীয়।
স্রষ্টা, পালনকর্তা, প্রভু হিসেবে যে-আল্লাহকে তিনি মেনে নিয়েছেন, সেই আল্লাহই তাঁর ঐশী গ্রন্থ কুরআনে হিজাবের আদেশ দিয়েছেন। যে-নাবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কথা তিনি সত্য বলে স্বীকার করেন, সেই নাবী তাঁর সুন্নাহয় নারীদের হিজাবের নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেছেন,
“বিশ্বাসী মুসলিম নারীদের বলবে, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে; তাদের সতীত্ব রক্ষা করে; (মুখমণ্ডল, হাতের কব্জি) বাদে তাদের দেহের অন্যান্য অংশ উন্মুক্ত না করে; চাদর দিয়ে সারা শরীর মুড়ে নেয় এবং নিজেদের স্বামী, বাবা, শ্বশুর, ছেলে, সৎ ছেলে, ভাই, ভাইয়ের ছেলে, বোনের ছেলে, মুসলিম নারী, মালিকানাধীন দাসী, অধীনস্থ বৃদ্ধ এবং নাবালক শিশুদের ছাড়া অন্যদের কাছে নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে।” [সূরা আন-নূর, ২৪:৩১]
“হে নাবী! তুমি তোমার স্ত্রী-কন্যাদের ও বিশ্বাসী মুসলিম পুরুষদের স্ত্রীদের বলো, তারা যেন নিজেদের গায়ে আবরণ টেনে দেয়। এতে তারা সম্ভ্রান্ত মহিলা হিসেবে পরিচিতি পাবে, ফলে তাদের উত্যক্ত হওয়ার আশংকা কম থাকবে।” [সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৫৯]
সংক্ষেপে: আমাদের এই বোন যদি প্রকৃত অর্থেই ইসলামের উপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখেন, দ্বীন বা জীবন ব্যবস্থা হিসেবে ইসলামকে আদর্শ মানেন, তাহলে তিনি কীভবে ইসলামের বিধিবিধানের ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারছেন না?
◾অজুহাত ২
◾“ইসলামিক পোশাকের ব্যাপারে আমার কোনো আপত্তি নেই। তবে আমার বাবা-মা আমাকে হিজাব পড়তে বারণ করেন। বাবা-মা’র নিষেধাজ্ঞা না মানলে আমি কি জাহান্নামে যাব না?”
এই অজুহাতের উত্তর বহু আগেই দিয়ে গেছেন আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ মানুষ নাবী মুহাম্মাদ (তাঁর উপর শান্তি বর্ষিত হোক). প্রজ্ঞাগুণে অল্প কয়েকটি কথায় তিনি এর উত্তরে বলেছেন,
“যে কাজে স্রষ্টার অবাধ্যতা করা হয়, সেই কাজে স্রষ্টা বাদে অন্য কারও বাধ্য হওয়া যাবে না।” (আহমাদ : ১০৪১)
সন্দেহ নেই, ইসলামে মা-বাবার মর্যাদা অনেক ঊর্ধ্বে। বিশেষ করে মা’কে দেওয়া হয়েছে স্বতন্ত্র মর্যাদা। আল্লাহর ইবাদাহ ও তাওহীদের মতো ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটো বিষয়ের সঙ্গে একই আয়াতে মা-বাবার সাথে ভালো আচরণের কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেছেন,
“আল্লাহর উপাসনা করো, তাঁর সাথে কাউকে শরিক করো না। আর মা-বাবার সাথে ভালো আচরণ করো।” [সূরাহ আন-নিসা, ৪:৩৬]
তাই সকল ক্ষেত্রেই মা-বাবার বাধ্য থাকতে হবে, কেবল একটি মাত্র ক্ষেত্র ছাড়া। সেটা হচ্ছে মা-বাবা যদি কখনো এমন কোনো কাজ করতে বলেন, যেটা আল্লাহর বিধিনিষেধের নির্ধারিত সীমালঙ্ঘন করে।
আল্লাহ বলেছেন,
“কিন্তু তারা যদি এই চেষ্টা করে, যাতে তুমি আমার সাথে কোনো কিছুকে শরীক করো, যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তাহলে তুমি তাদের আনুগত্য করবে না...” [কুরআন ৩১:১৫]
অন্যায় কাজে তাদের অবাধ্য হওয়ার মানে এই না যে, আমরা তাদের সাথে ভালো আচরণ করব না, তাদের যত্ন নেব না। কারণ, এই একই আয়াতের পরের অংশে আল্লাহ বলে দিয়েছেন, “তবে পার্থিব জীবনে তাদের সাথে ভালো আচরণ করবে।”
সংক্ষেপে: মা-বাবাকে উপযুক্ত সম্মান করবেন, তাদের সাথে ভালো আচরণ করবেন; কিন্তু তাই বলে এমন কোনো কাজে তাদের বাধ্য হওয়া যাবে না, যে কাজে আল্লাহর অবাধ্যতা করতে হয়।
◾অজুহাত ৩
◾“আসলে আমি যাদের সাথে যে সমাজে চলাফেরা করি, সেখানে আমার বর্তমান ড্রেসআপ বাদ দিয়ে ইসলামিক পোশাক মেনে চলা সম্ভব না।”
এ ধরনের কথার পেছনে দুটো কারণ থাকতে পারে:
হিজাবের ব্যাপারে তিনি হয়তো আন্তরিক ও সৎ কিন্তু পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনায় হিজাব নিয়ে দোনোমনায় ভুগছেন। আবার এমনও হতে পারে, হালফ্যাশনের সাথে তাল মেলাতে যেয়ে তিনি শুধু মাথায় রংচঙা স্কার্ফ পড়েন; পরিপূর্ণ পর্দার ব্যাপারে মোটেও আন্তরিক নন।
পারিপার্শ্বিক অবস্থান ও মানসম্মানের ভয়ে যে বোনটি পর্দা করতে পারছেন না, তাঁর প্রতি আমাদের পরামর্শ: বোন, আপনি কি এটা জানেন না যে, পরিপূর্ণ পর্দার শর্ত পূরণ না করে কোনো অবস্থাতেই একজন নারীর ঘর থেকে—যে কোনো প্রয়োজনেই হোক—বের হওয়ার অনুমতি আল্লাহ দেননি?
প্রতিটা মুসলিম নারীরই দায়িত্ব ইসলাম তাঁদের কী মর্যাদা দিয়েছে, ইসলাম তাঁদের কী করতে বলেছে সেগুলো জানা; সর্বোপরি ইসলাম সম্পর্কে ন্যূনতম বেসিক জ্ঞান অর্জন করা। প্রচুর সময় ও শ্রম ব্যয় করে আপনি কত কিছু শিখে নিচ্ছেন, কিন্তু যে জ্ঞান আপনাকে আল্লাহর শাস্তি থেকে নিরাপদ রাখবে, মৃত্যুর পর আল্লাহর ক্রোধ থেকে আপনাকে রক্ষা করবে, সেই জ্ঞান অর্জনের ব্যাপারেই আপনার যত অবহেলা?
আল্লাহ কি বলেননি,
“যদি তোমাদের জানা না থাকে, তাহলে জ্ঞানী ব্যক্তিদের জিজ্ঞেস করো।” [সূরা আন-নাহ্‌ল, ১৬:৪৩]
কাজেই পরিপূর্ণ পর্দার জন্য কী কী প্রয়োজন সেটা শিখুন।
কোনো কাজে বা বিশেষ প্রয়োজনে যদি বাইরে যেতে হয়, তাহলে অবশ্যই যাবেন। তবে সঠিকভাবে পরিপূর্ণ পর্দা করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে নিয়ে বের হবেন। শয়তানের কূটচালকে ধ্বংসের নিমিত্তে এগিয়ে যাবেন। কারণ যে প্রয়োজনে আপনি বের হচ্ছেন, তার চেয়ে নিজের সৌন্দর্য প্রদর্শনের ফলে সমাজে সেটা যে পরিমাণ দূষণ ছড়াবে তা অনেক অনেক বেশি মারাত্মক।
বোন, আপনি যদি আপনার নিয়্যাতের ব্যাপারে নিষ্ঠাবান হন, এবং পরিপূর্ণ পর্দার ব্যাপারে আসলেই আন্তরিক হন, তাহলে মানসিকভাবে দৃঢ় হন। একবার যখন ইসলাম মানা শুরু করবেন তখন দেখবেন আপনাকে সাহায্য করার জন্য হাজারো হাত এগিয়ে আসছে। আপনার মন যদি ইসলামের কোনো বিধানের ব্যাপারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়, তাহলে আল্লাহ আপনার কাজ সহজ করে দেবেন। কারণ তিনিই তো বলেছেন,
“আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার জন্য সংকট থেকে বের হওয়ার পথ করে দেবেন। আর তাকে এমন জায়গা থেকে জীবিকার ব্যবস্থা করে দেবেন যা সে কখনো কল্পনাও করতে পারে না।” [সূরা আত-তালাক, ৬৫:২-৩]
অন্যদিকে আমাদের যে বোনটি হালফ্যাশনের জালে আটকা পড়েছেন তার জন্য আমাদের পরামর্শ:
সম্মান ও মর্যাদা দেওয়ার মালিক আল্লাহ তা‘আলা। পোশাকের আভিজাত্য, হাল ফ্যাশনের সাথে তাল মিলিয়ে চলা এগুলো কারও সম্মান ও মর্যাদা নির্ধারণ করতে পারে না। কেবল আল্লাহ ও তাঁর বার্তাবাহকের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) প্রতি পূর্ণ আনুগত্য এবং আল্লাহর শারী‍‘আহর বিধিবিধান মেনে পরিপূর্ণ পর্দার মাধ্যমেই নিজের আত্ম-মর্যাদা ও সম্মান নির্ধারিত হয়। শুনুন এ ব্যাপারে আল্লাহ কী বলছেন,
“তোমাদের মধ্যে যে সবচেয়ে বেশি ধার্মিক, আল্লাহর কাছে সে-ই সবচেয়ে বেশি মর্যাদার অধিকারী।” [সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১৩]
কাজেই সেই দিনকে ভয় করুন, যেদিন আজকের কথিত প্রগতিশীল, মর্যাদাসম্পন্ন নারীদের ডেকে আল্লাহ বলবেন,
“আজকের এই শাস্তি উপভোগ করো! পৃথিবীতে তো নিজেকে খুব শক্তিশালী সম্ভ্রান্ত মনে করতে! এটাই সেই শাস্তি, যে ব্যাপারে তোমরা সন্দেহ করতে।” [সূরা আদ-দুখান, ৪৯:৫০]
সংক্ষেপে: আল্লাহর বিধিনিষেধ অমান্য করে, তাঁর ক্রোধ অর্জন করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা সম্ভব না। সম্ভব না জান্নাতে পৌঁছা। পৃথিবীতে কে আপনাকে সম্মান দিল, আর কে দিল না, কোন পোশাকে লোকে আপনাকে সুন্দর বলল, আর কে বলল না, এগুলো মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন। হিজাব বা পরিপূর্ণ পর্দা করুন কেবল আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য, আল্লাহর কাছে সম্মানিত হওয়ার জন্য।
◾অজুহাত ৪
◾“এত গরম আমাদের দেশে, একদমই সহ্য করতে পারি না। এত গরমে কীভাবে হিজাব করব?”
গরমের তীব্রতা কত মারাত্মক হতে পারে এ ব্যাপারে আল্লাহ বলছেন,
“ওদের বলো, জাহান্নামের আগুন আরও বেশি গরম; যদি তারা বুঝত!” [সূরা আত-তাওবাহ, ৯:৮১]
নরকের আগুনের তীব্রতার সাথে এই দুনিয়ার তাপমাত্রার তুলনা কীভাবে সম্ভব!
বোন, জেনে রাখুন—শয়তান আসলে আপনাকে এমন এক ফাঁদে ফেলেছে, এমন এক জাল বুনেছে আপনার সামনে, যে জাল ছিঁড়ে গেলে পৃথিবীর এই সামান্য উত্তাপ থেকে আপনি গিয়ে পড়বেন জাহান্নামের উত্তপ্ত আগুনে।
শয়তানের এই ফাঁদ থেকে বেড়িয়ে আসুন। সূর্যের উত্তাপকে নিগ্রহ না ভেবে মহান আল্লাহর একটা অনুগ্রহ হিসেবে ভাবুন। কেননা সূর্যের এই উত্তাপ আপনাকে সেই সত্যকে মনে করিয়ে দেয় যে, জাহান্নামের আগুনের তীব্রতা এর চেয়ে আরও কত লক্ষ কোটি গুণ বেশি! যে গরম আপনি এখন সহ্য করছেন, জাহান্নামের উত্তাপের তুলনায় তা কিছুই নয়।
তাই পার্থিব আয়েশ ত্যাগ করে ফিরে আসুন আল্লাহর আনুগত্যের ছায়াতলে। গায়ে তুলে নিন নিরাপত্তার আবরণ। নিজেকে বাঁচান জাহান্নামের কঠিন শাস্তি থেকে। যে শাস্তির ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন,
“সেখানে তারা কোনো ঠাণ্ডা বস্তুর স্পর্শ পাবে না; ফুটন্ত ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি ছাড়া অন্য কোনো পানীয়ের স্বাদ পাবে না।” [সূরা আন-নাবা, ৭৮:২৪-২৫]
সংক্ষেপে: জান্নাতের চারপাশ ঘিরে আছে কষ্ট, সংগ্রাম আর কঠোর পরিশ্রম, অন্যদিকে জাহান্নামের চারপাশে ছড়ানো আছে কামনা-বাসনার প্রলোভন। সবচেয়ে মহামূল্যবান পুরস্কার পেতে একটু ঘাম না ঝরালে কি হয়?
◾অজুহাত ৫
◾“আমার ভয় হয়, আমি হয়তো আজকে হিজাব করে কাল আবার ছেড়ে দেব। কারণ, আমি অনেককেই দেখেছি হিজাব করে আবার ছেড়ে দিতে!”
এই বোনকে আমি বলব: সবাই যদি আপনার এই যুক্তি প্রয়োগ করে তাহলে হয়তো এরা এভাবে আস্তে আস্তে পুরো ‘দ্বীন’কেই ছেড়ে দেবে।
কারণ কেউ হয়তো ভবিষ্যতে ‘সালাত’ ছেড়ে দেওয়ার ভয়ে ‘সালাত’ ধরবেই না। বুড়ো বয়সে রামাদানের ‘সিয়াম’ পালন করতে পারব না, এই ভয়ে তারা হয়তো যুবতী বয়সেও সিয়াম পালন করবে না।
আপনি কি টের পাচ্ছেন না, শয়তান কীভাবে আপনাকে তার ফাঁদে ফেলছে। সঠিক পথ থেকে আপনাকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে।
আপনার পালন করা কাজটি যত ছোটই হোক না কেন—হোক সেটা নফল কিংবা সুন্নাহ—কাজটা যদি আপনি সবসময় নিয়মিত করেন, তাহলে আল্লাহ তাতেই সবচেয়ে বেশি খুশি হন। সেক্ষেত্রে হিজাবের মতো অবশ্যপালনীয় একটা কাজে আল্লাহ কতটা খুশি হবেন, ভাবা যায়? নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “কাজ যতই ছোট হোক, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় ‘আমাল সেটাই, যে কাজটা কেউ নিয়মিত করে।” [বুখারী, ১১/১৯৪]
যে মানুষগুলো একসময় হিজাব করা ছেড়ে দিয়েছে, আপনি কি কখনো তাদের এই ছেড়ে দেওয়ার কারণ অনুসন্ধান করেছেন, যাতে করে আপনি এই সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠতে পারেন? যতক্ষণ পর্যন্ত না আপনি সত্যকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরতে পারছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত কেন আপনি এই সত্য পথনির্দেশের ব্যাপারে পরিপূর্ণ আস্থা অর্জনের কারণ ও যুক্তিগুলো খুঁজে দেখছেন না?
সত্য ও সঠিক পথের উপর অবিচল থাকার জন্য আমরা আল্লাহর কাছে দু‘আ করতে পারি। যাতে করে আল্লাহর দ্বীন তথা জীবনব্যবস্থার সাথে আপনার সুদৃঢ় বন্ধন গড়ে ওঠে। সালাতে আমরা বেশি বেশি দু‘আ জানাতে পারি, কারণ আল্লাহ বলেছেন,
“ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে (আল্লাহর) কাছে সাহায্য চাও।” [সূরা আল-বাকারাহ, ২:৪৫]
সঠিক পথের উপর অবিচল থাকার আরেকটা উপায় হচ্ছে ইসলামিক বিধিবিধানগুলো সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা; পূর্ণাঙ্গভাবে সেগুলো মেনে চলা। এর মধ্যে হিজাব বা পরিপূর্ণ পর্দা অন্যতম। আল্লাহ বলেছেন,
“তাদের যা বলা হয়েছে, তারা যদি সেটা মেনে চলত, তাহলে এটা তাদের জন্যই ভালো হতো। উপরন্তু এটা তাদের ঈমানকে আরও মজবুত করত।” [সূরা আন-নিসা’, ৪:৬৬]
সংক্ষেপে: সঠিক পথ ও সত্যের উপর অবিচল থাকার জন্য অন্যতম প্রধান যে দুটো উপায় আছে, আপনি যদি সে দুটো উপায় অবলম্বন করেন, তাহলেই আপনি পাবেন ঈমানের সুমিষ্ট স্বাদ। এরপর আপনার মনে আর কখনোই একে ছাড়ার ইচ্ছা জাগবে না।
◾অজুহাত ৬
◾“হিজাব করলে কেউ আমাকে বিয়ে করবে না। তাই, বিয়ে করার আগ পর্যন্ত আমি হিজাব করব না।”
কোনো স্বামী যদি আপনাকে পর্দাহীন রাখতে চায়, জনসম্মুখে আপনার সৌন্দর্য প্রদর্শনে তার কোনো আপত্তি না থাকে, তাহলে সে আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ করল। সত্য কথা বলতে, এ ধরনের পুরুষ আপনার স্বামী হওয়ারই যোগ্য নয়।
আল্লাহ আপনাকে যেটা করতে বলেছেন, সেই বিধান রক্ষায় যার কোনো মাথা ব্যাথা নেই, সে লোক আপনার জান্নাতে প্রবেশের বাধা বৈ আর কিছু নয়। বরং এ ধরনের স্বামীরা আপনার জাহান্নামে যাওয়ার পথকেই আরও সুগম করবে।
আল্লাহর অবাধ্যতায় যে ঘরের বুনিয়াদ গড়ে ওঠে, যে পরিবারে অহরহ এমন কাজ করা হয় যাতে আল্লাহ ক্রোধান্বিত হন, এমন ঘরে পার্থিব জীবনে সবসময় দুঃখকষ্ট ও দুর্দশা লেগেই থাকবে। আর পরকালের সীমাহীন দুর্ভোগ তো আছেই।
কারণ আল্লাহ বলেছেন,
“যে আমার স্মরণ থেকে বিমুখ হবে (অর্থাৎ এই কুরআনে বিশ্বাস করবে না, কিংবা এই কুরআনের বিধিনিষেধ মেনে চলবে না) তার জন্য রয়েছে কষ্টের জীবন; আর পুনরুত্থানের দিন আমি তাকে অন্ধ অবস্থায় ওঠাব।” [সূরাহ তাহা, ২০:১২৪]
বিয়ে আল্লাহর এক বিশেষ অনুগ্রহ। কার সাথে কার বিয়ে হবে এটা আল্লাহর ইচ্ছার অধীন। আপনি কতজন নারীকে দেখেছেন যারা হিজাব করছেন অথচ তাদের বিয়ে হয়নি? অন্যদকে কতজন নারীকে দেখেছেন যারা হিজাব করে না এবং অবিবাহিত?
আপনি যদি বলেন যে হিজাব না করার পেছনে মূল কারণ বিয়ের মতো পবিত্র একটা বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া, তাহলে একটি কথা জেনে রাখুন, অপবিত্র বা খারাপ কাজের মাধ্যমে ইসলামে কখনো ভালো কিছু অর্জন করা যায় না।
উদ্দেশ্য যদি আসলেই মহৎ কিছু হয়, তাহলে সেটা অবশ্যই বৈধ ও পবিত্র উপায়ে অর্জন করতে হবে।
সংক্ষেপে: যে বিয়ের ভিত্তি গড়ে উঠেছে পাপ ও মন্দ কাজের উপর তাতে আল্লাহর কোনো বারাকাহ থাকবে না। কাজেই এই অজুহাতে পরিপূর্ণ পর্দা থেকে বিরত থাকা মোটেও বুদ্ধিমতী নারীর কাজ নয়।
◾অজুহাত ৭
◾“আমি হিজাব করি না, কারণ আল্লাহই তো বলেছেন, ‘আর তোমার প্রভুর অনুগ্রহের কথা প্রকাশ্যে বলো।’”
◾“সুন্দর রেশমি চুল আর আকর্ষণীয় যে সৌন্দর্য দিয়ে আল্লাহ আমাকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছেন আমি সেটা কীভাবে আবৃত রাখি?”
দেখা যাচ্ছে আমাদের এ বোনটি সেসব ক্ষেত্রে আল্লাহর কিতবের অনুসরণ করছেন, যেসব ক্ষেত্রে এই কিতাবের বিধিবিধান তাঁর ব্যক্তিগত কামনা ও বুঝের সাথে খাপ খায়। কিন্তু যখন কিতাবের বিধানগুলো তাঁর মনের সাথে মেলে না, তখন তিনি সেগুলো অনুসরণ করেন না। কারণ, যদি তা-ই না হতো, তাহলে তিনি এই আয়াতটি কেন অনুসরণ করছেন না:

“সাধারণত যেটুকু প্রকাশ পায়, তা ছাড়া তাদের অন্যান্য সৌন্দর্য যেন প্রকাশ না করে;” [সূরাহ আন-নূর, ২৪:৩১]
এবং,
“তোমার স্ত্রী-কন্যা এবং অন্যান্য মুসলিমদের স্ত্রী-কন্যাদের বলো তারা যেন তাদের শরীরের উপর চাদর টেনে দেয়।” [সূরাহ আল-আহযাব, ৩৩:৫৯]
এই অজুহাত যিনি দেখান, তিনি মূলত আল্লাহ যেটা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছেন, সেটাই করার বাহানা খুঁজছেন। এভাবে তিনি আল্লাহর দেওয়া বিধিবিধান পাল্টে নিজেই নিজের জন্য আইন প্রণয়ন করছেন যেন। তার এ আইনের নাম সৌন্দর্য-প্রকাশ (আত-তাবাররুজ) ও অনাবৃতকরণ (আস-সুফূর)। আসলে শারী‍‘আহর বিধিনিষেধ মানতে আগ্রহের অভাবই এ ধরনের যুক্তির মূল কারণ।
সংক্ষেপে: আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের উপর সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ বা নেয়ামত হচ্ছে ঈমান (বিশ্বাস) ও হিদায়াহ (সঠিক পথের নির্দেশ). এই ঈমান ও হিদায়াতের একটি বহিপ্রকাশ হচ্ছে হিজাব। এত বড় একটি নি‘আমাহর কল্যাণ ও আশীর্বাদ কেন আপনার মধ্যে ফুটিয়ে তুলবেন না? কেন আপনি এমন নিরাপত্তা মুফতে গ্রহণ করবেন না?
◾অজুহাত ৮
◾“আমি জানি পরিপূর্ণ পর্দা বা হিজাব করা নারীদের জন্য ফরজ, তবে আল্লাহ যখন আমাকে হেদায়েত করবে আমি তখনই হিজাব করব।”
এই বোনের কাছে আমাদের প্রশ্ন আল্লাহর হিদায়াহ পাওয়ার জন্য তিনি কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন? বা এজন্য তিনি কী পরিকল্পনা করেছেন? প্রত্যেকটা কাজ হওয়ার পেছনে আল্লাহ তাঁর প্রজ্ঞাগুণে কিছু কারণ বা মাধ্যম ঠিক করে রেখেছেন।
একারণেই একজন অসুস্থ ব্যক্তিকে সুস্থ হওয়ার জন্য ওষুধ খেতে হয়। একজন পর্যটককে ঘুরে বেড়ানোর জন্য গাড়িতে চড়তে হয়। এ ধরনের আরও অনেক উদাহরণ রয়েছে।
হিদায়াহ বা সঠিক পথের দিকনির্দেশনা পাওয়ার জন্য আমাদের এই বোন কতটুকু চেষ্টা করেছেন? তিনি কি ইসলামিক জ্ঞান অর্জনের জন্য কোনো পদক্ষেপ নিয়েছেন?
একইসাথে আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে কি এই দু‘আ করেছেন,
“আমাদের পরিচালিত করুন সঠিক পথে।” [সূরা আল-ফাতিহা, ১:৬]
আল্লাহর হিদায়াহ লাভের জন্য যারা আমাদের এই বোনটিকে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করতে পারেন, তারা হলেন অন্যান্য ধার্মিক মুসলিম নারীগণ। যতক্ষণ না তিনি দ্বীনের উপর অটল হচ্ছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত অন্যান্যরা তাকে বারবার আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন। দৃঢ় বিশ্বাসী এসব মুসলিমাদের সান্নিধ্যে আমাদের এই বোনটির তাকওয়া বা আল্লাহর প্রতি সচেতনতা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাবে।
আর এভাবেই তিনি ধীরে ধীরে আল্লাহর বিধিবিধানের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করবেন। অর্জন করবেন আল্লাহর সন্তুষ্টি।
সংক্ষেপে: হিদায়াহ লাভের ব্যাপারে আমাদের এই বোনটি যদি সত্যিই আন্তরিক হন, তাহলে তিনি নিজেই সচেষ্ট হবেন, কী করলে তিনি সঠিক পথনির্দেশ পাবেন।
◾অজুহাত ৯
◾“আমার বয়স অনেক কম, হিজাব করার সময় আমার হয়নি এখনো।” বা
◾“বয়স হলে হজ করার পর পর্দা করব”
বোন আমার, মৃত্যুর দূত আপনার আশেপাশেই ঘুরছে। যেকোনো সময়ই সে আপনার প্রাণ হরণ করে নেবে। শুধু আল্লাহর নির্দেশের অপেক্ষা। আল্লাহ বলেছেন,
“যখন তাদের মৃত্যুর সময় আসবে, তখন তারা এক মুহূর্তও এদিক সেদিক করতে পারবে না।” [সূরাহ ‘আরাফ, ৭:৩৪]
আপনার বয়স কম না বেশি সে জন্য মৃত্যু অপেক্ষা করে না। হয়তো এমন সময় আপনার মৃত্যু এসে পড়বে, যখন কিনা আপনি ডুবে আছেন পাপাচার, অবাধ্যতা ও আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণে। হয়তো এমন সময় আপনার মৃত্যু ঘণ্টা বেজে উঠবে যখন আপনি পরিপূর্ণ পর্দা ছাড়াই বাইরে বের হয়েছেন কিংবা গায়ে জড়িয়েছেন আপত্তিকর কোনো পোশাক।
বোন আমার, অন্যায় ও পাপকাজের রেসে না-নেমে, যারা আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে দ্রুতলয়ে তাঁর পানে অগ্রসর হচ্ছে আপনি তাদের সাথে প্রতিযোগিতায় নামুন। কারণ, আল্লাহ বলেছেন,
“তোমরা তোমাদের প্রভুর ক্ষমা ও সেই জান্নাতের দিকে ধাবিত হওয়ার প্রতিযোগিতা করো, যে জান্নাতের ব্যপ্তি মহাকাশ ও পৃথিবীর ন্যায় প্রশস্ত। এমন জান্নাত প্রস্তুত রাখা হয়েছে শুধু তাদের জন্য যারা আল্লাহ ও তাঁর বার্তাবাহককে বিশ্বাস করে।” [সূরাহ আল-হাদীদ, ৫৭:২১]
বোন, আল্লাহকে ভুলে যেয়েন না, তাহলে এই দুনিয়া ও পরকালে আল্লাহও আপনাকে ভুলে যাবেন। আপনার উপর থেকে তাঁর দয়া, মায়া, মমতার দৃষ্টি তুলে নেবেন। আল্লাহকে যথাযথভাবে উপাসনা না করে, তাঁর আনুগত্য না করে আপনি আপনার আত্মার হক আদায় করছেন না, ভুলে যাচ্ছেন আপনার নাফ্‌সের কথা।
ভণ্ডদের ব্যাপারে আল-কুরআনে আল্লাহ বলেছেন,
“ওদের মতো হয়ো না, যারা আল্লাহকে ভুলে যায়, যার ফলে আল্লাহও তাদেরকে তাদের নিজেদের কথা ভুলিয়ে দিয়েছেন।” [সূরাহ আল-হাশ্‌র, ৫৯:১৯]
বোন, পাপের বোঝা ভারি না করে অল্প বয়স থেকেই হিজাব করা শুরু করুন। কেননা, আল্লাহ শাস্তি দানে খুবই কঠোর। পুনরুত্থানের দিনে তিনি আপনার জীবনের প্রতিটা মুহূর্তের হিসেব নেবেন।
সংক্ষেপে: ভবিষ্যতে করবেন এমন আশা ছেড়ে দিন। কেয়া পাতা কাল হো না হো? এক মুহূর্ত বেঁচে থাকার নিশ্চয়তাই বা কে দিচ্ছে আপনাকে?
◾অজুহাত ১০
◾“হিজাব বা পরিপূর্ণ পর্দা করলে লোকজন আমার গায়ে বিভিন্ন ইসলামিক দলের তকমা লাগিয়ে দেবে। আর আমি এসব দলাদলি মোটেও পছন্দ করি না।”
বোন, ইসলামে মাত্র দুটো দল আছে। মহান আল্লাহ তাঁর গ্রন্থে এই দুটো দলের নামই উল্লেখ করে দিয়েছেন।
প্রথম দল হচ্ছে আল্লাহর দল। তাঁর আদেশের আনুগত্য এবং তিনি যা করতে নিষেধ করেছেন, তা থেকে বিরত থাকার কারণে, এই দলটিকে তিনি চূড়ান্ত বিজয় দান করবেন।
আর দ্বিতীয় দলটি হচ্ছে, অভিশপ্ত শয়তানের দল। এরা আল্লাহর আদেশ অমান্য করে এবং পৃথিবীত অশান্তি সৃষ্টি করে।
আপনি যদি আল্লাহর আদেশের অনুসরণ করেন—যার মধ্যে হিজাব একটি—তাহলে আপনি সাফল্য লাভকারী আল্লাহর দলের একজন গর্বিত সদস্য।
কিন্তু যখন আপনি পরিপূর্ণ পর্দা করেন না, আল্লাহর বিধিনিষেধ মানেন না, আপনার সৌন্দর্য প্রদর্শন করে বেড়ান, তখন আপনি শয়তানের নৌকোয় উঠে বসলেন। আপনি তখন গলা মেলালেন শয়তানের সঙ্গী-সাথী, ভণ্ড-মুনাফিক ও অবিশ্বাসী-কাফিরদের সাথে। বন্ধু হিসেবে এদের চেয়ে জঘন্য আর কে আছে?
আপনি কি টের পাচ্ছেন না, কীভাবে আপনি আল্লাহর কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন, আর ধীরে ধীরে শয়তানের গুহায় প্রবেশ করছেন? বোন আমার আল্লাহর দিকে এগিয়ে যান, তাঁর নির্দেশনা মেনে চলুন:
“আল্লাহর শাস্তি থেকে আল্লাহর রহমতের দিকে ধাবিত হও। আমি (মুহাম্মাদ) তোমাদের জন্য তাঁর পক্ষ থেকে একজন সতর্ককারী।” [সূরাহ আয-যারিয়াত ৫১:৫০]
হিজাব বা পরিপূর্ণ পর্দা করা একটি উচ্চ পর্যায়ের ইবাদাত। কোনো লোকের মতামত বা ব্যক্তিগত পছন্দ, কোনো দলের পরিচিতির সাথে এর কোনো লেনাদেনা নেই। হিজাবের বিধান দিয়েছেন মহাজ্ঞানী স্রষ্টা আল্লাহ।
সংক্ষেপে: আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, তাঁর দয়া ও জান্নাতের প্রত্যাশায় মেনে চলুন আল্লাহর বিধান। মানুষ ও জিনদের মধ্যে মন্দদের অপবাদে কুছ পরোয়া নেহি। এদের কটূক্তিকে দেওয়ালে ছুঁড়ে ফেলে অনুসরণ করুন পূর্বসূরি সংগ্রামী ও জ্ঞানী নারী সাহাবাদের (তাঁদের সবার উপর আল্লাহ সন্তুষ্ট হোক) দৃষ্টান্ত।
শেষ কথা:
শয়তান নারীদেহকে পুরুষের চোখে আকর্ষণীয় মোহনীয়ভাবে তুলে ধরে। আপনার চুলের স্টাইল, আঁটসাঁট পোশাক আপনার অবয়বকে স্পষ্ট করে মেলে ধরে। ছোট ছোট পোশাক, মাত্রাতিরিক্ত সৌন্দর্যের বহিপ্রকাশ শয়তানকে তুষ্ট করে, অন্যদিকে আল্লাহর ক্রোধের উদ্রেক করে।
এভাবে দিনকেদিন আপনি দূরে সরে যান আল্লাহর কাছ থেকে। আর ক্রমান্বয়ে সন্ধি পাতেন অভিশপ্ত শয়তানের সাথে। যতদিন না অনুশোচনা করছেন, প্রতিটা দিন আপনি ভাগীদার হচ্ছেন আল্লাহর অভিশাপ আর ক্রোধের। প্রতিমুহূর্তে আপনি কবরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। মৃত্যুদূত আপনার আত্মাকে হরণ করার জন্য সদাপ্রস্তুত।
“প্রত্যেক মানুষই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আর কেবল পুনরুত্থানের দিনেই তোমাদের কৃতকাজের পূর্ণ প্রতিদান দেওয়া হবে। আর সেদিন যাকে জাহান্নামের আগুন থেকে সরিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সে-ই প্রকৃত সফলকাম। এই পার্থিব জীবন কেবলই ছলনার সামগ্রী।” [সূরাহ ‘আলি-ইমরান, ৩:১৮৫]
স্টেশন ছেড়ে ট্রেন চলে যাওয়ার আগেই উঠে পড়ুন তাওবার বগিতে। অনুশোচনা করে ফিরে আসুন আল্লাহর কাছে।
বোন আমার, একটু গভীরভাবে ভেবে দেখুন। সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই সিদ্ধান্ত নিন।


আজ থেকেই তবে শুরু হোক আল্লাহর সন্তুষ্টির সাথে পথচলা।